কালের ফাটল

দারচেন, কৈলাশ। তিব্বত। 

ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে নেবে পারলিকা আর শিখা তাদের প্রথম হিমালয়ের দর্শন পেল। দার্জিলিং থেকে অবশ্য কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেছে কিন্তু এই যাত্রায় এই প্রথম।

“ওই দেখ পারো দি । বরফে ঢাকা পাহাড়।”

“এই তো সবে শুরু রে। এখন তো পাহাড় আর  পাহাড় দেখবো।”

“এটা কি এভারেস্ট?”

“মনে হয় না। কাঠমান্ডু থেকে এভারেস্ট কাছেই হলেও, সোজাসুজি দেখা যায়না। ওটা গনেশ হিমাল হতে পারে।”

শিখা আর পারো -- পারোলিকা   মুখার্জি -- দুজনেই জেমিনি কনসাল্টিং কোম্পানিতে কাজ করে। পারো ফরেনসিক একাউন্টেন্ট, টাকা পয়সার কারচুপি ধরার কথা কিন্তু সব ব্যাপারেই তার ডাক। চল্লিশ পেরিয়ে গেছে, শরীরে একটু মেদ জমেছে কিন্তু লম্বা চেহারা বলে বোঝা যায়না।  শিখা মান্ডি বয়েসে  ছোট। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু কলেজে এন সি সি করে আর কারাটে, মার্শাল আর্টস শিখে তার দুর্ধর্ষ বডি। সে পারোর সঙ্গে ফিল্ড ওয়ার্ক করে। ওদের 'ত্রুটি'তে, তৃতীয় আর একজন আছে, কল্যাণ রায়, ক্রয়, যে তুখোড়  কম্পিউটার হ্যাকার, কিন্তু তার বেজায় ল্যাদ, বাড়ি থেকেই কাজ করে। বেরোতে চায় না।

পারো আর শিখা  দুজনেই জিন্স আর কলার ওয়ালা টি-শার্ট পরেছে, তার ওপর বেশ ভারী জ্যাকেট। পায়ে  ভারী বুট। মাথায় টুপি, চোখে কালো চশমা, যদিও সেগুলো আপাতত ঠেলে কপালে তোলা। তারা আজ চলেছে বহু দূর, সুদূর কৈলাশ পর্বত আর তার সংলগ্ন মানস সরোবরের দিকে। পারোর বহু দিনের ইচ্ছে ছিল কিন্তু সময়, সুযোগ আর সহযাত্রী পায়নি বলে এতদিন যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আর দেরি নয়, এবার সে বেরিয়ে পড়েছে। কিসের টানে? না কার ঠেলায়?

সে যাই হোক, তাদের যাত্রাটা একটু ঘুর ভাবে হচ্ছে। সাধারণত ভারত সরকার যে যাত্রার বন্দোবস্ত করে তাতে বেশ কিছুটা হাঁটতে হয় বা ঘোড়ায় চড়তে হয়। ওরা সেই পথে না গিয়ে তিব্বতের রাজধানী, লাসা হয়ে যাবে। এতে রথ দেখা আর কলা বেচা দুই হবে। লাসা, শিগতসের মতো তিব্বতের শহর দেখা হবে আর তার ওপর পুরো রাস্তাটাই বাসে করে যাওয়া যাবে। হাঁটা বা ঘোড়ার কোনো ব্যাপার নেই। অবশ্য সেটা কৈলাশ পর্বতের পাদদেশ অবধি। কৈলাশ পরিক্রমা করতে গেলে আবার তিন দিনের হাঁটা বা ঘোড়া। কিন্তু সেটা পরের কথা, পৌঁছে দেখা যাবে।

কোলকাতা থেকে লাসা যাওয়ার কোনো ডিরেক্ট ফ্লাইট হয়না। তাই প্রথমে তারা কাঠমান্ডু এসেছে। ভারতীয়দের কৈলাশ মানস যেতে হলে চীন সরকারের কাছ থেকে পিলগ্রিম ভিসা নিতে হয়। ব্যাপারটা একটু গোলমেলে এবং সময় সাপেক্ষ। তাই ওরা দুদিন হাতে নিয়েই কাঠমান্ডু এসেছে।

“এই ফাঁকে পশুপতিনাথ মন্দিরটাও দেখে নেবো।” 

এয়ারপোর্ট থেকে প্রথমে ইয়াক অ্যান্ড  ইয়েটি হোটেল। একসময় নেপালের রানা শাসক, বীর শমসের এর লাল দরবার ছিল। আজ বিলাসবহুল হোটেল। মার্বেলের সিঁড়ি, ছাদের ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি, আর বাগানের নিস্তব্ধতা - সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত দ্বৈততা তৈরি করে, যেখানে অতীতের রাজকীয় ঐশ্বর্য আর এক অদৃশ্য ট্র্যাজেডির প্রতিধ্বনি মিশে যায়। রাজপরিবারের অতিথিশালা থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের আড্ডাখানা -- ইয়াক অ্যান্ড ইয়েতি যেন নেপালের ইতিহাসের রক্তিম সন্ধ্যার সাক্ষী। রাজপ্রাসাদের কুখ্যাত হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল পাশের অন্য এক প্রাসাদে, নারায়ণহিতিতে, তবু এই হোটেলের দেয়ালেও যেন সেই রাতের গুঞ্জন আজও মৃদু শোনা যায়। 

“রাজপ্রাসাদ ভারতবর্ষে অনেক দেখেছি, আগে আমাদের ভিসার খবর নেওয়া যাক।”

ট্রাভেল এজেন্ট কৈলাশ জার্নিস এর  অফিসে গিয়ে বোঝা গেল যে তাদের ভিসা এখনো এসে পৌঁছয় নি। একজন দুজনের জন্য পিলগ্রিম ভিসা হয় না। একটা কুড়ি-পঁচিশ জনের দল তৈরী করে দিল্লি থেকে ভিসা আনতে হয়।এজেন্ট বললো আশা করছে যে আগামীকাল ভিসা চলে আসবে আর তার পরের দিন রওনা হওয়া যাবে।

সেদিন সন্ধ্যেবেলা হোটেলের আসে পাশে একটু শপিং করা হল।  পরের দিন একধার থেকে বুড়ানীলকণ্ঠ মন্দির,  পশুপতিনাথ মন্দির, গুহ্যেশ্বরী মন্দির,  বৌদ্ধনাথ স্তুপ,  চাঙ্গু নারায়ণ মন্দির  আর স্বয়ম্ভুনাথ স্তুপ দেখতেই সারাদিন কেটে গেল। একটাই ছোট্ট অসুবিধে হোল শিখাকে  নিয়ে। তার সেদিন পিরিয়ডসের তৃতীয় দিন। তাই ওর আর মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকে পুজো দেওয়া হলো না। মন্দিরের বাইরেই ছবি আর সেলফি তুলে রেখে দিল।

“তুই একেবারে কৈলাশে গিয়েই শিবের মাথায় জল ঢেলে আসবি।”

দেড় ঘন্টার ফ্লাইট। এয়ার চায়নার এয়ারবাস ৩১৯ যখন তাদের লাসার গংগোর এয়ারপোর্টে নামালো তখন দুপুর পেরিয়ে বিকেল হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু তিব্বতে চায়নার ঘড়ি চলে তাই সূর্য ডুবতে অনেক দেরি হয়। নীল আকাশ, রোদ ঝলমল করছে কিন্তু ১১৫০০ ফুট উচ্চতা তাদের মালুম দিল। পারো আর শিখা কেউই শারীরিক ভাবে অক্ষম নয়, কিন্তু দু পা হাঁটতেই বা কয়েক ধাপ সিঁড়ি চড়তেই হাঁপিয়ে যাচ্ছিল। দাঁড়িয়ে পড়ে একটু দম নিয়ে তবেই আরো হাঁটা।

“এইজন্যেই আমাদের এখানে দুদিন থাকতে বলেছে । একক্লাইম্যাটাইজ করতে হবে।”

“দুদিন এই পাতলা হাওয়ায় নিঃশাস নিলেই  আমাদের রেড ব্লাড সেল বেড়ে যাবে। অক্সিজেন বেশি যাবে।”

তিব্বতের সবচেয়ে বড় শহর লাসা । চীনের অভ্যন্তরীণ তিব্বত অটোনোমাস রিজেনের  রাজধানী। প্রথম দিন মোটামুটি হোটেলের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করা হল। একটা বড় রাস্তার ওপর ওদের হোটেল, রাস্তার ধারে নানা রকম দোকান। কিছু কেনা কাটা করা হল, খাওয়া হল। পরের দিন সারাদিন গেল পোটালা প্রাসাদ দেখতে। দালাই লামা যখন তিব্বতের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন তখন এই পোটালা প্রাসাদই ছিল তিব্বতের ধার্মিক আর রাজনৈতিক রাজধানী। যাকে তিব্বতি ভাষায় জং (dzong) বলে। প্রাসাদটি দুটো ভাগে বিভক্ত। পত্রং কর্পো বা সাদা প্রাসাদ ছিল লামার বসবাস আর রাজনৈতিক কেন্দ্র আর পত্রং মারপো বা লাল প্রাসাদ হল ধর্মীয় স্থান। তিব্বতি গাইড ওদের দল বেঁধেই সব ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল, তবুও পত্রং মারপোর  ভেতরে ঘোরার সময়, পারো আর শিখা একবার দলছুট হয়ে একটা ঘরে ঢুকে পড়েছিল। সে ঘরটা  অন্যগুলোর চেয়ে বেশী গরম, বাতাসে একটা মৃদু গন্ধ ছিল -- কাঠ, ঘি আর কিসের যেন ধাতব গন্ধ। ঘরের দেয়ালে ক্ষীণ ধাতব দীপ্তি খেলছিল, যেন ভেতর থেকে আলো উঠছে। ঠিক সেই সময় তাদের সঙ্গে দেখা করতে এগিয়ে এল এক অল্পবয়েসী লামা।

“আপনারা কি কলকাতা থেকে আসছেন?” ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে প্রশ্ন করলো। তিব্বতে ভারতীয় ভাষা শোনাই যায়না। তাই পারো কিছুটা অবাক হয়ে গেল।

“হ্যাঁ । আপনি কি করে জানলেন।” পারো হিন্দিতেই উত্তর দিল।

“দেখে মনে হল। তাই বললাম।” লামা হাসলো। “আচ্ছা আপনারা কি অতীশ শ্রীজ্ঞানের মূর্তি দেখেছেন?”

“এখানে অনেক মূর্তি দেখছি, কোনটা কি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।”

“আপনাদের বাংলা দেশের মানুষ । মৈত্রেয় মন্দিরে ওনার মূর্তি আছে আছে ।” লামা পথ দেখাল। “চলুন দেখাচ্ছি।”

মন্দিরে বিরাট মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি। তার পাশেই অতীশের মূর্তি। “মৈত্রেয় বুদ্ধ হচ্ছেন শেষ আর পঞ্চম বুদ্ধ। পৃথিবী যখন রসাতলে চলে যায়, তখন তাঁর আবির্ভাব হয়।”

“তাহলে ইনি  কি আমাদের কল্কি অবতারের মত।” শিখার জিজ্ঞেস করলো।

“তিব্বতের বৌদ্ধ চিন্তাধারায় অনেক ভারতীয় হিন্দু প্রভাব আছে।” তিব্বতে আসার আগে পারো একটু খোঁজ খাবার করেছে। “তুর্কি আগ্রাসনের হাত থেকে বৌধ্যধর্মকে বাঁচাতে অতীশের মতো বেশ মানুষ ভারত ছেড়ে হিমালয় পেরিয়ে তিব্বতে চলে এসেছিলেন।”

“তাঁদের নিয়ে আশা অনেক ভাবনা চিন্তা, ধ্যান ধারণা এখন এখানে রয়ে গেছে।” লামা ওদের বোঝালো। “যেমন ধরুন মৈত্রেয় বুদ্ধ থাকেন সম্বল নগরে। দরকারের সময় নেবে আসবেন।”

“একেই কি  পশ্চিমি বুদ্ধ ভক্তরা শাম্বালা বলে? 

“হ্যাঁ । কিন্তু আবার দেখুন,  ভারতের উত্তর প্রদেশে সম্বল বা সম্ভল বলে একটা শহর আছে। পৌরাণিক মতে কল্কি অবতারের ঐখানেই আবির্ভূত হবেন।”

“আবার এই সম্বলকে বা সম্ভল কী আবার  হিন্দু ধর্মে জ্ঞানগঞ্জ বলা হয়। যেখানে শুধু উঁচু মানের সাধকরাই  পৌঁছেতে পারে।”

“সনাতন ভারতবর্ষের সঙ্গে প্রাচীন তিব্বতের গভীর যোগ আছে।”

“কিন্তু চীন এসে তিব্বতকে দখল করে নেওয়ার পর ভারতের সঙ্গে সেই সম্পর্ক কি আর আছে?”

“আছে, আছে।” লামা হাসলো। “কিন্তু এসব নিয়ে প্রকাশ্যে বেশি কিছু বলবেন না।”

“আপনি হঠাৎ এই কথা বলছেন কেন?” কিন্তু ততক্ষনে লামা কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে ।

লাসার পর শিগতসে। মানস সরোবরে যাওয়ার পথে এইটাই বেশ বড় শহর যেখানে পারোদের এসে আরো দুদিন থাকার কথা। এখানকার তাশি লুনপো জং এ এইসময় থাংকা প্রদর্শন উৎসব হয়ে। তিনদিন ধরে এই উৎসব চলে আর সেই সময় কিছু বিরাট, এবং বহু প্রাচীন, থাংকা খুলে জং এর বাইরে ঝুলিয়ে রাখা হয়। বছরে একবার এগুলি সবার সামনে উন্মুক্ত করা হয়। প্রথম দিন অমিতাভ বুদ্ধ, দ্বিতীয় দিন শাক্যমুনি বুদ্ধ আর তৃতীয়দিন মৈত্রেয়। তাশি লুনপো জং পোটালা প্রাসাদের মতোই কিন্তু সামান্য ছোট। দালাই লামা যেমন পোটালা তে থাকতেন, তিব্বতের দ্বিতীয় লামা, পাঞ্চেন লামা এখনো এখানে থাকেন এবং চীন তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

শিগতসের তাশি লুনপো জং এ গিয়ে পারো আর শিখা আর একটা অসাধারন তিব্বতি ধারণার সঙ্গে পরিচিত হল। বিরাট মৈত্রেয় বুদ্ধমূর্তির পাশে রয়েছে আর এক অদ্ভুত দৃশ্য । উলঙ্গ পুরুষ নারীর যুগল মূর্তি। নারীকে কোলে বসিয়ে মৈথুন রত । এইটা দেখেই শিখার মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেল। দু এক সেকেন্ডের জন্যে চোখে অন্ধকার।

সে পারোর হাতটা চেপে ধরে নিজেকে সামলে নিল । 

“এটা কি?”

“একেই বোধয় বলে ইয়াব - ইয়ুম ।”

“ঠিক বলেছেন,” পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলো। “ওই নীল দেহ পুরুষ হলেন সামন্তভদ্রক।” তাদের পাশে আবার এক লামার আবির্ভাব হয়েছে। “বুদ্ধের এক আশ্চর্য রূপ। আর ওনার কোলে স্বেতকায়া সামন্তভদ্রি।” ভাঙা ভাঙা হিন্দি আর ইংরেজিতে বোঝালো।

“এই মূর্তির অর্থ কি? এটা কি আমাদের খাজুরাহো মন্দিরের কামাতুরা মানুষের রমণ দৃশ্য?”

“বজ্রযান মতে এটা হল পিতা মাতার দৃশ্য। মানুষের নয়, জগতের।”

“ঠিক বুঝলাম না।”

“এখানে পুরুষ মানে সামন্তভদ্রক হলেন করুণা আর দক্ষতার রূপক আর সামন্তভদ্রি হলেন বিশুদ্ধ জ্ঞান বা প্রজ্ঞা ।”

“প্রজ্ঞা পারোমিতা ?”

“হ্যাঁ আর প্রজ্ঞার সঙ্গে করুণার মিলনেই এই জগৎ তৈরী হয়।”

“এত আমাদের শিব শক্তির গল্পের ঠিক বিপরীত ! আমাদের শিব হলেন বিশুদ্ধ জ্ঞান কিন্তু শক্তির সঙ্গে মিলিত না হলে তিনি জড় অনড় । দুজনের মিলনেই জগতের জন্ম।”

“এরা খুব স্পষ্ঠ ভাবে এই মিলনটা দেখিয়ে দিয়েছে।”

“আমাদের শঙ্করাচার্য এটাকেই সাংকেতিক ভাবে শ্রী যন্ত্রের মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন।”

ঠিক সেই সময়ে তাদের সামনে আর এক টুরিস্ট ভিডিও তুলছিল। পারো দেখলো যে ওদের দিকে ঘুরতেই  ক্যামেরাটা যেন কিছুক্ষন থেমে গেল। যেন তাদেরই ছবি তুলছে। তারপর আবার সে অন্যদিকে ঘুরে গেল। কিন্তু পারো নিশ্চিত ছিল, লেন্সটার দৃষ্টি কিছুটা বেশি সময় ধরে তার দিকেই স্থির ছিল।

শিগতসের পর সাগা হয়ে একেবারে মানস সরোবরের তীরে, শিবকুন্ড বলে এক ছোট্ট গ্রাম, ওরা অবশেষে পৌঁছলো । লাসা আর শিগতসে তে তবু মোটামুটি ভাল হোটেল ছিল কিন্তু যতই ওরা তিব্বতের ভেতরে ঢোকে ততই থাকার ঘরের অবস্থা খারাপ। সাগাতে তো ওদের আর নিজেদের ঘর পাওয়া গেল না। ওদেরই দলের আর দুই সদস্যের সাথে একই ঘরে শুতে হল। আর শিবকুণ্ডে তো আর হোটেল নেই। মাটির তৈরী কুঁড়ে ঘর বা মাড হাউস। সবচাইতে অস্বস্তিকর হল টয়লেট। তার ছাদ  নেই আর তার থেকেও বিপদজনক যে দরজাও নেই আর জলও নেই। বোতলে করে জল নিয়ে একজনকে দরজায় পাহারায় দাঁড় করিয়ে আর একজনের কাজ সারা।

কিন্তু মানস সরোবরের নৈস্বর্গিক দৃশ্যপটের সামনে এই সব অসুবিধার কথা তাদের মন থেকে মুছে গেল। লোকে পূর্ণিমার রাতে মানস আসার পরিকল্পনা করে কিন্তু তারা এসেছে অমাবস্যায়। আর অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে সে এক আলাদা চিত্র। ওদের মাড হাউসের মালিক তো ওদের হেসে বলেই দিল । “মেমসাব, আপলোক অভিতক পাঁচ তারা হোটেল মে ঠেরে হুয়ে হায় । লেকিন আজ আপ লাখো তারা হোটেল মে রাত বিতাইয়েগা।”

পথের ক্লান্তি ভুলে, ভোদকার শিশি খুলে পারো আর শিখা মানস  সরোবরের তীরে দু রাত্রি কাটিয়ে দিল। সন্ধ্যে বেলা সূর্যাস্ত। রাতে আকাশের কোটি কোটি তারা। ভোরের সূর্যদয়। বিরাট জলাশয়। তারওপর দুধের সরের মতো পাতলা বরফের ঢাকা। সেই ভেঙে কনকনে ঠান্ডা জলে স্নান। তারপরে ডুগডুগি বাজিয়ে শিবের মতন নাচ,  সবই  হলো। আর তার পরেই বিভ্রাট! পরের দিন পারোর গায়ে জ্বর!

মানস থেকে কিছু দূরেই দারচেন গ্রাম। সেইটাই ওদের পরের গন্ত্যব্য আর  থাকার জায়গা। সেখানে পৌঁছে যে হোটেল পাওয়া গেল সেটা একটু ভাল। টয়লেট আছে। কিন্তু ঠান্ডা প্রচন্ড। ওষুধ খেয়ে পারোর জ্বর কিছুটা চাপা পড়লেও নিঃস্বাসের কষ্ট। নাক দিয়ে মাঝে মাঝে রক্ত পড়ছে। পরের দিন ওদের দলের  বাকিরা সকলেই ঘোড়ায়  চড়ে কৈলাশ পরিক্রমায় যাবে । আরো দু দিন পরে তারা ফিরবে।  শিখার অল্প বয়েস, ব্যায়াম করা ভালো শরীর । ও সহজেই যেতে পারতো। কিন্তু পারোর ওই নিদারুন অবস্থা দেখে ও আর গেল না। 

“আমার জন্যে তোর আর যাওয়া হোল না রে শিখা।” 

“সে নিয়ে তুমি একদম ভেবো না এ পারো দি।”

“কৈলাশপতি আমাদের এতদুরে  টেনে এনে এইরকম ফাঁসিয়ে দিলেন?”

“এক রাত হয়ে গেছে, আর দুই রাত্রি এই দারচেনেই কাটিয়ে দেব।”

পরের দিন ওরা  দুজনে, বাসে চেপে কৈলাশের পাদদেশে যম দ্বার মন্দির অবধি গিয়ে, কৈলাশের অনেক ছবি তুলে আবার দারচেনের হোটেলে ফিরে এল। যারা  পরিক্রমা করবে, তারা সে দিন আর হোটেলে ফিরলো না। পারোর শরীরের অবস্থাটা বেশ খারাপের দিকে। কোনো রকমে একটু কিছু খেয়ে হোটেলের ঘরে ঢুকে পড়তে পারলেই যেন শান্তি।

প্রায় সবাই পরিক্রমা করতে বেরিয়ে গেছে। দুদিন পরে ফিরবে। হোটেল খালি। পারো আর শিখা যখন হোটেলে পৌঁছলো তখন সবে সন্ধ্যে হয়েছে। আকাশে তারা ফুটতে শুরু করেছে।  রিসেপশনে এক পাহাড়ি যুবক। তিব্বতি মুখ চোখ কিন্তু আবার একেবারে ওদের মতো নয়।

“আপনারা গেলেন না?” একটু টানা টানা বাংলায় জিজ্ঞেস করলো।

“না। আমার শরীর খুব খারাপ। কিন্তু আপনি বাংলা জানেন? কি অদ্ভুত।”

“সব বাঙালিরাই অবাক হয়ে যায়। কিন্তু তার পেছনে একটা কারণ আছে।” সে হেসে বললো।


ছেলেটা বাংলা বলছে বটে কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে যে সে মোটেই খুব সাবলীল নয়। উচ্চারণ, কথার ভঙ্গি আর শব্দের চয়ন বেশ অদ্ভুত। তাও মোটামুটি বোঝা যায় যে বাংলার মতোই কিছু বলছে। উড়িয়া বা অসমীয়া ভাষা বললে যেমন একটা আঁচ করা যায়। অনেকটা সেইরকম।

“শুনি শুনি।” পারোর গলায় উত্তেজনা। “কি কারণ?”

“আমার চার পুরুষ আগে,  আমার এক পূর্বপুরুষ চীন থেকে আপনাদের রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে গেছিলেন।”

“বাবা! কত যুগ আগে?”

“শুনেছি তখন রবি ঠাকুর বেঁচে আর তার সঙ্গে তিনি দেখাও করেছিলেন।”

“এ তো ঐতিহাসিক ব্যাপার।”

“শুধু তাই নয়, তিনি এক বাঙালি মেয়েকে ওখানে বিয়ে করেন আর থেকে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু শেষ অবধি সেটা হয়নি।”

“কেন? কি হয়েছিল?”

“তা জানিনা, তবে  উনি সেই মহিলাকে নিয়ে এই দেশেই আবার ফিরে আসেন। আর তখন থেকেই আমাদের পরিবারে একটা বাঙালিয়ানার চল রয়ে গেছে।”

“তার নাম, ঠিকানা কিছু পাওয়া যাবে? এত এক গল্প হয়ে যাবে।”

“আমি তো এত কিছু বলতে পারবো না। কিন্তু আমাদের গ্রামে গেলে আরো কিছু খোঁজ পেতে পারেন।”

“আপনাদের গ্রাম কতদূর?”

“বেশি দূর নয়। সকালে গিয়ে রাতে ফিরে আশা যায়।”

“আমার শরীরটা ভালো থাকলে যেতাম।”

“দেখুন। কাল যদি শরীর ঠিক লাগে, নিয়ে যাব।”

পারে দিন ভোর উঠে পারোর শরীর একেবারে সুস্থ ! 

“কি রে, আজ তো একদম ফিট। জ্বর নেই। নিঃস্বাসের কষ্ট হাওয়া। নাকে রক্ত নেই।”

“এত ভাল কথা।”

“এমন হলে কৈলাশ পরিক্রমা করে আসতাম।”

হোটেলের রিসেপশন খালি। শুধু সেই গতকালের ছেলেটা বসে আছে। কিন্তু তার চোখে তখন যেন অন্য এক আলো, শিখা খেয়াল করলো।

“এই তোমার নামটা জানা হয়নি।”

“লোবসাং দর্জি । যাবেন নাকি আমাদের গ্রামে?”

তিনটে ঘোড়ায় তিনজন চলেছে। লোবসাং সামনে, পেছনে পারো আর শিখা । 

“আচ্ছা আমরা কি কৈলাশ পরিক্রমার পথেই যাচ্ছি।”

“না। উল্টো দিকে। এদিকে খুব একটা কেউ আসে না। খুব কম লোকই এই সব পথ চেনে।”

“আচ্ছা আমরা পোটালা আর সিগ্যাটসের জংএ  দেখলাম যে আমাদের ভারতীয় চিন্তা ভাবনার সঙ্গে তোমাদের তিব্বতি অনেক কিছুরই বেশ মিল আছে।”

“আজকে আরো কিছু দেখবেন।”

“কি?”

“কালী মন্দির।”

“সে কি? এত কোনোদিন শুনিনি।”

“আপনারা অতীশ শ্রীজ্ঞানের কথা জানেন, বাংলা দেশ থেকে উনি অনেক কিছু এনেছিলেন। কিন্তু আমার পূর্বপুরুষও সেই রকম কিছু নিয়ে এসেছিলেন।” লোবসাং হাসলো ।

“কি?  কালী মূর্তি?”

“শান্তিনিকেতনের কাছেই শুনেছি অনেক বিখ্যাত কালী মন্দির আছে।”

“হ্যাঁ, বক্রেশ্বর, ফুল্লরা, তারাপীঠ  …”

“বক্রেশ্বর নামটা আমাদের এখানে বেশ কিছু লোক জানে।”

দুটো পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে একটা সরু ফাঁক। সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় পারোর শরীরটা কেমন যেন নড়ে উঠলো। ট্রেনের এক কামরা থেকে লাফিয়ে আর এক কামরায় যেতে যেমন হয় আর কি। যেন সূর্যের আলোটা একটু ম্লান হয়ে গেল, হওয়াটা ভারী। ঠিক বোঝা গেল না, কিন্তু চারিদিকটা যেন কিছুটা পালটে গেল। তিব্বতে, মানস সরোবরের আসে পাশে, দারচেন গ্রামে গাছ দেখা যায় না। ধু ধু করছে হাড় শীতল ঠান্ডা মরুভূমি। কিন্তু এদিকে দু একটা করে গাছ দেখা যাচ্ছে। হাওয়াও অত ঠান্ডা নয়।

“এদিকটায় সারাদিন রোদ পড়ে।  পাথর গরম হয়ে যায়। আপনারা আপনাদের ভারী গরম জামা এইখানে খুলে রেখে যেতে পারেন। যখন ফিরবো আবার নিয়ে নেবেন।” লোবসাং ওদের একটা চায়ের দোকান দেখিয়ে দিল।

আরো ঘন্টা দু-এক চলার পর ওরা  গিয়ে যেখানে পৌঁছলো সেখান দিয়ে  একটা ছোট নদীর মত বয়ে গেছে। তার পাশেই গোড়ে  উঠেছে একটা বেশ সুন্দর মরুদ্যান। সেখানে দু একজন লোক দেখা গেল। লোবসাং তাদের ডেকে নিজেদের ভাষায় কি সব বললো। তারপর হেসে হাত নেড়ে যে যার কাজে চলে গেল। মরুদ্যানের এক পাশে ঠিক নদীটার গায়ে দু তিনটে ছোট ছোট ঘর। সেই ঘরে গিয়ে কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে এক  বৃদ্ধ দম্পতি বেরিয়ে এল। দুজনেরই  সেই একই রকম অস্বাভাবিক বাংলা ভাষার উচ্চারণ। চার পাঁচ পুরুষ আগে আনা তাদের বাংলা ভাষা বেশ পাল্টে গেছে। বোঝা খুব সহজ নয়, তাও পারো আর শিখা কে পেয়ে তারা খুবই খুশি। যেন কতদিনের পুরোনো বন্ধুদের দেখা হয়েছে।

কথায় কথায় পারো যা বুঝলো সেটা মোটামুটি এইরকম। বীরভূম থেকে আশা তাদের পূর্ব পুরুষের মাধ্যমে শুধু বাংলা ভাষাই নয় একটা কালী পুজোর  ধারাও  তারা বয়ে নিয়ে চলেছে । ওদেরই পরিবারের তত্বাবধানে সযত্নে রাখা আছে একটা ছোট্ট কালী মূর্তি যেটাকে বহুযুগ আগে বীরভূম থেকে এক বাঙালি নববিবাহিত বধূ বুকে মাথায়  করে এনেছিল।

“এই মন্দিরটা  আমাকে দেখতেই  হচ্ছে । এখান থেকে কত দূর? ”

কিন্তু মন্দির দেখতে যাওয়ার ব্যাপারে এসে একটা অদ্ভুত বাধা লাগলো। বুড়ি মহিলা হাত পা নেড়ে পারো কে যেতে বারণ করলো।

“কিন্তু কেন?” ঠিক স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। শুধু হাসি হাসি মুখ । আবার বারণ। ভাষা আর উচ্চারণের ফাঁদে পড়ে কেউই কাউকে ঠিক বোঝাতে পারছেনা যে অসুবিধাটা কোথায়। শুধু এইটুকু বোঝা যাচ্ছে যে বৃদ্ধা বলছেন যে -- যা বোঝা গেল -- লোবসাং আর শিখা ঘুরে আসুক। তাতে কোনো অসুবিধা হবেনা । কিন্তু পারোর  যাওয়া উচিত হবে না । ওর শরীরে হাত দিয়ে -- বুকে, পেটে আর পেটের তলায় হাত দিয়ে বৃদ্ধা পারোকে  কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে।

“আমার শরীর ভালো আছে, অসুবিধে হবে না।” কিন্তু বুড়ি হাসে, আর বারণ করে।

যাইহোক, বেগতিক দেখে পারো আর চাপা চাপি করলো না। লোবসাং আর শিখা কে ছেড়ে দিয়ে ও বুড়ো বুড়ির সঙ্গে ওদের বাড়ির ভেতরে গিয়ে বসলো। সুন্দর ছিমছাম সাজানো বাড়ি। সাধারণ তিব্বতি বাড়ি যেমন হয় তার থেকে একটু আলাদা। একটা যেন বাংলার ছাপ আছে। সেখানে বসে কিছুটা খাওয়া দাওয়া হল। এলো মেলো কথা । তিব্বত বীরভূম শান্তিনিকেতন এই সব নিয়ে অসংলগ্ন কিছু কিছু আলোচনা।  

কিন্তু পারোর মনটা খচখচ করছিল। মন্দিরটা দেখা হল না। সেটা বোধয় বুড়ি বুঝতে পারলো । তাই খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে, বুড়োকে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে, শুধু পারোকে বাড়ির ভেতরে ডেকে নিয়ে গেল। পেছন দিকের একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে ওকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল।

অন্ধকার ঘর। চোখটা ঠিক হতেই পারো দেখলো ঘরের দেওয়ালে একটা বাংলার পটচিত্র আর সেই পটচিত্রে কালীর এক অসাধারণ রূপ । এই রূপে আমরা কালীকে সাধারণত দেখি না। এই পটচিত্রে  শিব আর  কালী,  দুজনেই একেবারে উলঙ্গ এবং মৈথুন রত। শিব নিচে, কালী ওপরে -- যাকে বলে বিপরীত রতাতুরাং। উমান অন টপ । কাউগার্ল স্টাইল পোস । পারো এইরকম পটচিত্রের কথা শুনেছিল কিন্তু কোনোদিন চোখে দেখেনি। এই প্রথম দেখলো। কালীর  এই অস্বাভাবিক রূপ মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক বাঙালি নিজের ঘরে রাখতে লজ্জা পায় । তাই তারা মন্দিরে মণ্ডপে একটা অন্য মূর্তির পুজো করে। সেখানে কালী গায়ে চাপা দিয়ে  শিবের বুকের ওপর জীব বার করে দাঁড়িয়ে থাকে। 

কালীর পটচিত্রের দুই পাশে আরো দুটো ছবি। সেগুলো অবশ্য পটচিত্র নয়। বাঁ দিকে একটা পাহাড়ি ছাগলের ছবি। বিরাট বাঁকানো শিঙ।  উল্টো দিকে একটা পুরোনো তিব্বতি পতাকা। সূর্য উঠছে আর তার দুপাশে দুটো সিংহ। স্নো লায়ন। কিন্তু পারোর মাথায় এত কিছু তখন ঢুকছেনা। কিরকম ঘুম ঘুম পাচ্ছে। তার পরেই সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল। সে বোধয় ঘুমিয়েই  পড়লো ।

যখন ঘুম কাটল, বা অচৈতন্য ভাব সরে গেল, তখন বেলা ঢলে পড়েছে। ধড়মড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে, লোবসাং আর শিখা ফিরেছে। শিখার চুল এলোমেলো, মুখে রোদে ধোওয়া তৃপ্তি, আর চোখে এক নিঃশব্দ দীপ্তি। পারো এক মুহূর্তেই চিনে ফেলল -- এই শান্তি, এই হাসি, মেয়েদের মুখে ফুটে ওঠে শুধুই পুরুষের সঙ্গে নিবিড় মিলনের পর।

“কী রে? কী  রকম দেখলি? কী  করলি ?”

“চলো বাড়ি গিয়েই বলবো।”

সূর্যাস্ত হতে আর বেশি দেরি নেই। দারচেনে ফিরতে হবে। আগামীকাল ভোরে  ওদের দলের বাকি সদস্যরা  কৈলাশ পরিক্রমা শেষ করে ফিরে আসবে আর তারপরেই দুপুরের খাবার খেয়ে ওদের দারচেন ছেড়ে শিগতসের পথে লাসা যেতে হবে।

লোবসাং ওদের দুজনকে নিয়ে ফিরে চললো ।  চায়ের দোকানে ওদের জামা কাপড় তুলে নিয়ে সেই পাহাড়ের ফাঁক পেরোতেই আবার আবহাওয়া সেইরকম ভীষণ ঠান্ডা হয়ে গেল। রাত গভীর হয়ে এল। আকাশে আবার লক্ষ লক্ষ তারার ঝিকি মিকি। গভীর রাতের অন্ধকারে লোবসাং ওদের দুজনকে ওদের হোটেলে পৌঁছে দিয়ে চলে গেল।

পারো ভেবেছিল যে লোবসাং চলে যাবার পর ও ভালো করে শিখাকে জিজ্ঞেস করবে যে মন্দিরে গিয়ে কি দেখেছে ? আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন, কি করেছে? কিন্তু হোটেলে পৌঁছেই পারোর যেন আবার জ্বর জ্বর ভাব। সারাদিন শরীরটা যেমন তরতাজা ছিল সেটা আর নেই। গাটা  ম্যাজ ম্যাজ করছে । মাথা ঝিম ঝিম করছে। দেহের ক্লান্তিটা যেন ও এখানে রেখে চলে গেছিল, ফিরে এসে আবার তুলে নিল। আজ আর কথা না বাড়িয়ে তারা দুজনেই চুপচাপ শুয়ে পড়লো।

দলের বাকি সদস্যরা, যারা কৈলাশ পরিক্রমা করতে গেছে, তারা আগামীকাল সকালে ফিরবে। তার পরেই আবার বাসে করে শিগতসের পথে রওনা দিতে হবে। তারপর লাসা, কাঠমান্ডু হয়ে কলকাতা!

কিন্তু তার আগে একটু খুঁজে দেখা যাক পারো আর শিখা কৈলাশের পাদদেশে, দারচেনে এসে পৌঁছলো কী করে? 

রাজ বেঙ্গল হোটেল, কোলকাতা। 

প্রায় একবছর আগেকার কথা। 

চিড়িয়াখানার পাশে দ রাজ বেঙ্গল হোটেলের কফি শপে সকাল থেকে পারো আর শিখা বসে আছে। এক রাউন্ড কাপুচিনো খাওয়া হয়ে গেছে। যার অপেক্ষায় থাকা, তার কোনো লক্ষণ না দেখায় পারো আরেকটা করে বড় কাপুচিনো অর্ডার করলো, তার সঙ্গে কুকি।

পারোর আজ এখানে আসা হয়েছে এক অদ্ভুত  কেস নিয়ে। কালদর্পণ নামে একটি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেল হঠাৎই শহরের তরুণদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সেখানে ছেলে-মেয়েদের রগরগে ছবি দেখা যায়, যেগুলো প্ল্যাটফর্মের নিয়ম লঙ্ঘন না করেও বেশ কামোত্তেজক। চোখ আটকে যায় ।

যারা বেশি কমেন্ট করে বা বারবার রিঅ্যাক্ট করে, তাদের মধ্যে কিছু কিছু মানুষ একটি গোপন নিমন্ত্রণ পায় -- এক ধরনের ত্রিকাল ইভেন্টে যোগ দেওয়ার জন্য। যারা সাড়া দেয়, তাদেরও  ছবি  কিছুদিন পরে ওই হ্যান্ডেলে দেখা যায়। আশ্চর্যের ব্যাপার, এই ত্রিকাল ঘটনা নিয়ে কেউ স্পষ্ট কিছু বলতে চায় না; অনেকেই চেপে যায়।

কিছুদিন আগে কলকাতার এক প্রভাবশালী সরকারি আমলা এই ত্রিকাল নিয়ে বেকায়দায় পড়েছিলেন। সাধারণত সরকারি আমলাদের ভাব থাকে, “আমরা সবকিছুর উর্ধে,” তাই এই পরিস্থিতি তার ইগোতে লাগে । পুলিশকে ডেকে তিনি বলেছিলেন  -- “সাইটটা বন্ধ করতে হবে।”

সমস্যা হলো, কলকাতার পুলিশের বা আমলার ক্ষমতা শুধু শহরের মধ্যে সীমিত; অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মালিক বা সার্ভার অন্য দেশে থাকলে কোনো নিষেধাজ্ঞা খাটানো সহজ নয় । কোর্টের আদেশ ছাড়া বিশেষ  কিছু করা সম্ভব নয়, আর কোর্টে কিছু অকাট্য প্রমাণ না দিলে আদেশ পাওয়া কঠিন। সাইবার ক্রাইম বিভাগ এই বিষয়ে কিছু নাড়াচাড়া করেছে বটে, কিন্তু হ্যান্ডেলের মালিক নিজেকে এমনভাবে আড়াল করে রেখেছে যে সে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

শেষ পর্যন্ত পুলিশ পারোকে ডেকেছে আর এই ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে বলেছে। তাই সে  নিশিগন্ধা নামে একটি জাল আইডি থেকে ওই হ্যান্ডেলের  ছবিতে চার-পাঁচ বার রসাল কমেন্ট করেছিল । এর পরেই সে একটি নিমন্ত্রণ পায় -- রাজ বেঙ্গল হোটেলে আসার জন্য। 

এই কাজে নামার আগে পারো তার একটা ছোট্ট ব্যাক স্টোরি খাড়া করেছিল । তার প্রোফাইলে লিখেছিল যে সে গ্লোবাল সাউথ নাম একটা সংস্থা চালায় । আগে, কাজলাগড়ের কাজের, সময়  ক্রয় এই গ্লোবাল সাউথ বলে একটা কাল্পনিক সংস্থার ওয়েব সাইট খুলে দিয়েছিল। তারপর চ্যাট-জিপিটি দিয়ে প্রায় খান চল্লিশেক বিবিধ বিষয়ক প্রবন্ধ তৈরি করে ভোরে দেয় । তার ওপর কোনো বিদেশী সেমিনারে ভাষণরত অচেনা  ভারতীয়  মহিলার ভিডিওতে পারোর মুখের অবয়ব লাগিয়ে একটা ডিপ ফেক ভিডিও তৈরী করে আপলোড করেদিয়েছিল । দেখে মনে হচ্ছিল যে  পারো, মানে নিশিগন্ধা, কথা বলছে। গুরুতর তথ্য নিয়ে।

সেই সকাল সাড়ে দশটায় এসে প্রায় দুঘন্টা বসে আছে শিখা  আর পারো । এরই মধ্যে দুটো কাপুচিনোর শেষ করে সাধারণতই দুজনের দেহে কিছুটা নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে।

"আজ বোধহয় আর কিছু হবে না। অনেক বেলা হল। আমার আজ একটু তাড়া আছে।"

"দাঁড়া না। এসেছি যখন শেষ দেখেই ছাড়বো।"

"পারো দি, আমি একটু বাথরুম থেকে ঘুরে আসছি। তুমি একটু ব্যাগ গুলো দেখো।"

"ঠিক আছে, আমি বসছি, তুই ঘুরে এলে আমি যাবো।"

মিনিট দশেক  পরে শিখা যখন ফিরে এলে তখন পারোর নিজের চাপ বেশ বেড়ে গেছে।

"বাপরে তুই কতক্ষন লাগালিরে। আমার তো অবস্থা টাইট।”

"দারুন বাথরুম, ভিতরে সোফা তে বসে থাকতে ইচ্ছে করছিলো।"

পারো নিজের পার্সটা চেয়ারের পেছনে আটকে রেখে বেরিয়ে গেল। বাথরুমটা একটু দূরে, করিডোর পেরিয়ে গ্র্যান্ড বলরুমের দিকে যেতে হয় । বিশাল দরজা ঠেলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পারোর চোখ ধাঁদিয়ে যাওয়ার অবস্থা। বাথরুম না বলরুম? বিরাট আয়না, সুন্দর ফ্রেগরেন্স, নরম বিশাল সোফা, সার-সার স্টল । সব ঝাঁ চকচকে। এক কোনে নীল উর্দি পরা আয়া। কিন্তু এত দেখার সময় নেই, পারোর প্রচণ্ড নিম্ম চাপ। অনেকগুলো স্টল বন্ধ, পরিষ্কার হচ্ছে; শুধু একটাই খোলা। পারো প্রায় দৌড়ে সেটায় ঢুকে পড়ল।

টয়লেটে একটু শান্তিতে বসতেই হঠাৎ সারা বাথরুমের আলোগুলো নিভে গেল, আর ফায়ার এলার্ম বেজে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গেই এমার্জেন্সি লাইট জ্বলে উঠল, তবে কেঁপে কেঁপে -- যেন জ্বলেও জ্বলছে না, ডিস্কো লাইটের মতো দপদপ করছে। পারোর চোখ ধাঁদিয়ে গেল। ফায়ার এলার্মের আওয়াজও অদ্ভুত, সাধারণ সাইরেনের বদলে লো-ফ্রিকোয়েন্সি বেস আওয়াজ । পারোর গায়ে কাঁটা দিল।

কিন্তু এই সবকিছু বড়জোর কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল । বেশি কিছু বোঝার আগেই আবার আলো ঝলমল করে জ্বলে উঠল, এলার্ম ফিকে হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পারো থতমত খেয়ে গেল, তারপর সবই ঠান্ডা। কপালে দু’এক বিন্দু ঘাম বেরিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, পারো বাথরুমের কাজ মহা শান্তিতে সেরে, মুখে গায়ে পারফিউম ছিটিয়ে, একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো।

"আরে নিশিগন্ধা  না?" বাথরুমের ঠিক বাইরে একজন স্মার্ট দেখতে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। শার্ট, ট্রাউসার, জ্যাকেট পরা, ওপেন কলার, টাই নেই । বয়েসে পারোর মতোই, কিন্তু পুরুষ মানুষ বলে চুলে সামান্য পাক ধরেছে। চোখে মুখে একটা হাসি খুশি কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত ভাব আছে। রাস্তায় দেখলে চোখ চলে যায়।

"হ্যাঁ , কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।"

"আমি রানা, আপনি কালদর্পণ হ্যান্ডেলে যা কমেন্ট করেন সেগুলো আমাদের বেশ ভালো লাগে। তাই আজ আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছি।"

"তাই? তাহলে আপনি আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন?"

"আমি না, আমাদের বোর্ড থেকে আপনাকে নির্বাচন করা হয়েছে।"

"সেটা জেনে ভালো লাগলো।"

"হ্যাঁ। আপনার গ্লোবাল সাউথে বেশ ভালো কাজ করছে। আপনার বক্তৃতাটা বেশ ভালো লাগলো।"

পুরুষমানুষ রূপের প্রশংসা না করে গুনের বা কাজের প্রশংসা করলে পারোর বেশি ভালো লাগে। কিন্তু পারো পোড় খাওয়া, ঝানু মহিলা। প্রচুর পুরুষ মানুষের প্রশংসা শুনেছে এবং বোঝে যে বেশির ভাগ লোকই এই প্রশংসা করে কোনো দুরভিসন্ধি নিয়ে। মানে সোজা কথায় তাকে পটিয়ে বিছানায় তোলার জন্যে। এসব লোককে সে সাধারণত কায়দা করে কাটিয়ে দেয় । কিন্তু আজ সে যেন একটু ঢিলে ঢালা। বিপদ বুঝেও লোকটিকে কাটিয়ে দিল না।

“কফি খাবেন?”

“এই দেখুন না, এক্ষুনি কফি খেয়ে উঠলাম। তাও একটা নয় দু দুটো কাপুচিনো।” পারো হেঁসে জবাব দিল।

“চলুন না, তবে লাউঞ্জে গিয়ে বিয়ার খাই।” ভদ্রলোকের হাসিটা খুবই মিষ্টি। মোহময়।

“আসলে আমার সঙ্গে আমার বন্ধু শিখা আছে। ও বলছিল ওর কোথায় একটা যাবার তাড়া আছে।” পারোর মনে একটা ছোট্ট উত্তেজনা উঠলেও সেটা আবার কি রকম মিলিয়ে গেল। যাবে ? না যাবে না?

“তাতে অসুবিধে কোথায়? ও থাকলে ভালোই হত । কিন্তু ওর কাজ থাকলে ওকে একটা ফোন করে দিন।”

“তাই বলছেন?” পারো কিছু না ভেবেই  ফোনটা বার করে শিখা কল করলো। “এই শোন, তুই এগিয়ে যা। আমি এদিকে একটু কাজ সেরে সন্ধ্যায় মিট করবো।”

রাজ বেঙ্গল হোটেলের লাউঞ্জ বারটা বেশ খালি। সপ্তাহের মাঝে, দুপুরের আগে এখানে খুব একটা ভিড় হয়না। রানা আর পারো এক কোনায় গিয়ে বসলো। জানলার ধারে কিন্তু চোখের একটু আড়ালে।

“কি নেবেন ম্যাডাম?”

“এত সকালে ?”

“তা যা বলেছেন।” রানা প্রায় পারোর মুখের কথাটা তুলে নিল । “এই সময়ে হুইস্কি বা রাম চলে না। তবে মার্টিনি চলতে পারে!” পারোর মনটা যেন কেমন আপ্লুত হয়ে উঠলো। দুপুরবেলা মার্টিনি সত্যিই খুব ভালো লাগে পারোর। "চলতেই  পারে।" পারোর ঠোঁটের কোণে হাসির ঝিলিক।

"আর মার্টিনি  যখন তখন নিশ্চয়ই ড্ৰাই, তাই না।" রানা ছোট্ট করে জেমস বন্ডকে তাদের আসরে টেনে আনলো । "আর ঘাঁটা নয়, ঝাঁকিয়ে দিতে বলবো।" রানা বারটেন্ডারকে ডেকে অর্ডার দিয়ে দিল।

"আপনি তো আমাকে ডাবল ও সেভেন এর পর্যায়ে পৌঁছে দিচ্ছেন?"

রানা হাঁসতে হাঁসতে বলল, “যুগ পাল্টাচ্ছে, লাসানা লিঞ্চ এখন জেন বন্ড।”

"কোথায় লাসানার  মতো সেক্সি কৃষ্ণাঙ্গী  আর কোথায় এই ভেতো বাঙালি, কি যে বলেন?"

"আসলে বুদ্ধির ধার থাকলেই হলো। আর আমাকে প্লিস আপনি বলবেন না।" ছোট্ট হাসি। "আমি আপনাদের ওয়েব সাইট দেখছিলাম, বেশ নতুন নতুন  চিন্তা ভাবনা নিয়ে আপনারা এই সাস্টেনেবল ইকোনোমি গড়ার কথা বলেছেন।"

তার সম্বন্ধে রানা এত কিছু খোঁজ খবর রাখে  দেখে  পারোর মনে ছোট্ট একটা  সন্দেহ হলেও, সেই চিন্তা বেশিক্ষণ টিকলো না। সুপুরুষ ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগছে।

"আপনি তো অনেক খবর রাখেন দেখছি!" নিজের প্রসংশা শুনে পারোর মন বেশ গদগদ। মার্টিনির গ্লাসে চুমুক দিয়ে পারো হাসে। "কিন্তু এই গ্লোবাল সাউথের পেছনে আর কিছু গল্প লুকিয়ে আছে।"

"কি গল্প?"

কয়েক বছর আগে পারো, পূর্ব মেদিনীপুরের কাজলাগড়ে প্রস্তাবিত থোরিয়াম ভিত্তিক ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে জমি আন্দোলনের ভেতরে লুকোনো একটা ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনে নামে। প্রকল্পের উদ্যোক্তা ও বিজ্ঞানী দুজনে হোমি ভাভার থোরিয়াম-স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে, কিন্তু তথাকথিত পরিবেশবাদী এনজিও “সবুজ সখা”র কর্ণধার জাফ্ফার ও সাংবাদিক লীলা গুপ্ত আন্দোলন উসকে দেয়। পারো ছদ্মবেশে ঢুকে ‘গ্লোবাল সাউথ’ নামে ভুয়ো আন্তর্জাতিক সংস্থা সাজিয়ে তথ্য জোগাড় করে, লীলার ফোনে স্পাই অ্যাপ বসায়। পরের দিকে জাফ্ফার খুন হয়, তার দেহ পাওয়া যায় প্ল্যান্টের দেয়ালের পাশে -- ঘটনাটি প্রথমে কোম্পানির ওপর দোষ চাপালেও পারোর গোয়েন্দাগিরিতে প্রকাশ পায় যে আন্দোলনের নেপথ্যে ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ঈর্ষা ও প্রতারণার জাল। জাফ্ফার, লীলা ও কানু সাঁত্রার ত্রিকোণ সম্পর্ক রক্তক্ষয়ের কারণ হয়; কানু গ্রেপ্তার হয়, জাফ্ফার মরে, লীলা পালিয়ে বাঁচে। শেষে প্রকল্প এগোয়, কৃষকেরা জমি বেচে সুখে থাকে -- সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের বিপরীত এক বাস্তববাদী সমাপ্তি ঘটে ।

কিন্তু এসব কি বলা উচিত? তাহলে তো ওর আসল পরিচয়টা বেরিয়ে যাবে। কথাটা ঘোরাতে হবে।

"তার আগে  আর একটা মার্টিনি হয়ে যাক।" পারো নিজের মার্টিনিটা এক ঢোঁকে শেষ করে দিল।" পারোর শরীরের ভেতরে একটা নরম সুখানুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে -- তবু কোথায় যেন একটুখানি অস্বস্তি, ঠিক ধরতে পারছে না। যদিও একজন সুশ্রী সুপুরুষ লোকের সঙ্গে বারে বসে  কথা বলতে বেশ ভালোই লাগছে।

"নিশ্চয়ই নিশ্চই ।"

"আসল গল্পটা খুব কম লোকেই জানে, আপনি হবেন চার কি পাঁচ নম্বর।"

"আবার আমাকে আপনি বলছেন, আপনি নিশি  আমি রানা। ঠিক আছে?" রানা একটা খুব মিষ্টি হাসি দিল।  "কিন্তু আসল গল্পটা কি?"

"তাহলে শুনুন।" কিন্তু ঠিক সময়েই আরো দুটো বড় মার্টিনি চলে এল । তাদের দিকেও তো খেয়াল রাখতে হবে!

"শোনো নিশি," মার্টিনিতে খেয়াল রাখতে রাখতে রানা আর একটা কথা পাড়লো । "এ রকম রহস্য রোমাঞ্চের গল্প এই ম্যাড়মেড়ে হোটেল লাউঞ্জে হয় না।"

"কোথায় হয়?"

"মার্টিনি শেষ করো, মাটির নিচে যাবো। তোমায় নিয়ে যাবো।"

"মাটির নিচে? পুঁতে দেবে না কি?"


রাজ বেঙ্গল হোটেলের একটা পুরোনো ডিস্কো নাচঘর ছিল -- "অচেনা"। সেটা হোটেলের বেসমেন্টে। সত্যিই মাটির নিচে। পারো যে কখন রানার হাত ধরে ফেলেছে সেটা ওর মনে নেই,  তবু দুজনে হাত ধরাধরি করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো।

সিঁড়িটার মুখে জ্বলজ্বল করছে এক সাবধানবাণী বিজ্ঞপ্তি - "শুধুমাত্র অনুমোদিত কর্মীদের জন্য" আর ঠিক সেইখানেই পারোর পা টা কেমন যেন হড়কে গেল। ঠিক হড়কানো নয়, যেন সব থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য, ক্ষনিকের জন্য চোখে আন্ধকার । তারপরেই আবার সব ঠিক, যেমন ছিল। পারো বোধয় রানার হাতটা আরো জোরে চেপে ধরে,  নিষেধের বিজ্ঞপ্তিতে অবজ্ঞা করে অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নেবে গেল।

"আমরা কোথায় যাচ্ছি রানা?"

"চল না,  গিয়েই দেখবে।"

"এসব তুমি চেনো কি করে?"

"অচেনা জায়গায় এটা আমার প্রথমবার নয়। চল।"

অচেনা লোকের সঙ্গে, অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একলা সিঁড়ি দিয়ে নেবে যেতে পারোর যে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল তা নয়, কিন্তু কি আশ্চর্য, অস্বস্তিটা যেন হয়েই আবার নেবে গেল। বেশি খাওয়ার পর ঢেঁকুর তুললে যেমন একটা স্বস্তির ভাব আসে! 

"আমরা কোথায় যাচ্ছি রানা?"

"পাশেই গঙ্গা আর তার ধারেই আর্মির কেল্লা। সাধারণ লোকের এই কেল্লায় ঢোকার অধিকার নেই আর তাও বা যাদের ঢোকার অনুমতি আছে, তারাও জানেনা যে এই কেল্লায় কোথায় কি আছে।"

"এ সব আপনি, মানে তুমি কি করে জানলে রানা?"

"যোগাযোগ থাকলে এই শহর, এই জগৎ সম্মন্ধে অনেক কিছুই জানা যায়। যোগাযোগ থেকেই প্রবেশাধিকার। নেক্সাস টু অ্যাক্সেস । এই দেখো, পৌঁছে গেছি।"

একটা দরজা খুলে রানা আর পারো যেখানে ঢুকলো সেটা একটা অদ্ভুত জায়গা।

"এটা কোথায়?" একটা সুড়ঙ্গর  মধ্যে ওরা দাঁড়িয়ে আছে । একদিকে সুড়ঙ্গের শেষ দেখা যাচ্ছে, তার বাইরে রোদ ঝলমল করছে। উল্টো দিকে সুড়ঙ্গটা ঘুরে চলে গেছে কোথাও।

"নদী থেকে কেল্লায় ঢোকার এটা একটা গোপন পথ। বাঁ  দিকে গেলে স্ট্র্যান্ড রোড। ডান দিকটা আরো ইন্টারেস্টিং, চলো দেখাই।"

কিছুটা এগিয়ে গিয়েই একটা শপিং মলের মতো জায়গা । প্রচুর দোকান, ফুড কোর্ট, ইনডোর স্পোর্টস, বার রেস্তোরাঁ । যেন পার্ক স্ট্রিট ওপর থেকে নিচে চলে এসেছে, কিন্তু ভিড় নেই। দু একজন লোক এদিক ওদিক দেখা যাচ্ছে। ওরা হাঁটতে হাঁটতে এক দোকানের সামনে এসে পড়লো। কাঁচের শোকেসে নানারকম ব্যাজ, ইউনিফর্মের বাটন, আর তার মাঝখানে একটা প্রতীক -- বাঁকা শিঙ ওয়ালা একটা ছাগল। অদ্ভুত।

পারোর মনে ক্ষীণ একটু সন্দেহ হলো। কোলকাতার মাটির তলায় এসব  সে  কি দেখছে? কিন্তু আবার সেই ভয়ের মত। মনের ভেতর থেকে সন্দেহের বুদবুদটা কিছুটা ভেসে উঠেই ফেটে গিয়ে, হারিয়ে গেল। বেশ ভালোই লাগছে।

"চলো তোমায় একটা মজার জায়গায় নিয়ে যাই।" 

আরো কিছুটা এগিয়ে একটা গেট, তার পেছনে একটা বাগান। "এই হলো বন নির - দ ফরেস্ট অফ ট্রিস।" পারো ভাবলো নির না নীড় ? সে যাই হোক, কিন্তু এত আলো, অথচ সবই  যেন কেমন অন্য জগতের। ভোরের আলোও নয় সন্ধের আলোও  নয়। বাতাসে অদ্ভুত এক গন্ধ, ধূপ না ফুল, নাকি মদিরা ?  বোঝা যায় না। কিন্তু একি ? দেখে তো মনে হচ্ছে লোকে যোগ ব্যায়াম করছে কিন্তু সকালেই একেবারে উলঙ্গ! কিছু ভাবার আগেই তাদের সামনে উপস্থিত হল হাসি মুখো  এক বলিষ্ঠ যুবক। তার গায়ে একটা সাদা টি-শার্ট, তাতে একটা প্যাগোডার মতো প্রাসাদের ছবি।

"এই হলো আমার বন্ধু তাশি। এ আজ তোমায় ফুল বডি ম্যাসাজ করে মন ভরিয়ে দেবে।" তারপর ছেলেটির দিকে ঘুরে, "পারো আমার খুব ভালো বন্ধু, ওনাকে ভালো করে আনন্দ দিও। যেন তোমাকে মনে রাখে।" তারপর আবার  পারোর দিকে ফিরে, "তোমার হয়ে গেলেই আমি ফিরে আসবো।" 

"কিন্তু  রানা? " পারো কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু রানা ততক্ষনে কোথায় চলে গেছে।

"আসুন ম্যাডাম, আপনার জামা কাপড় খুলে ফেলুন।" তাশির  মিষ্টি কথায় পারোর মন ধুয়ে সাফ হয়ে গেল। হাসি মুখে, জিন্স, টি-শার্ট আর আরো বাকি সব কিছুই খুলে ফেললো।  আর তারপর ঘুরে দেখলো যে  তাশিও তার শার্ট প্যান্ট সব খুলে ফেলেছে। তাশিকে  দেখে পারোর মুখচোখ একটু লাল হয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু  ছেলেটি হাসতে হাসতে ওর চোখে চোখ রেখে  আলতো করে ঠেলে মাটিতে, ঘাসের ওপর  শুইয়ে দিল। ....

বাইরে ঝলমলে রোদ । রানা আর পারো সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে স্ট্র্যান্ড রোডে একটা হলদে ট্যাক্সি তে উঠেছে। আকাশের রোদের মতোই পারোর মুখে একটা দিব্য আনন্দের আভা ঝলমল করছে। মুখে কোনো কথা নেই।

"কোথায় যাবে? বাড়ি?"

"হ্যাঁ, মানে  .. " তার পরেই পারোর মনে পড়লো। "এ মা ! ব্যাগটা হোটেলের কফি শপে ফেলে এসেছি। আমার সব ক্রেডিট কার্ড ওই ব্যাগে আছে।" 

"চলো ফিরে যাই, বড় হোটেল, নিশ্চই রেখে দিয়েছে।"

ট্যাক্সি হোটেল ঢুকে ওদের নামিয়ে দিল। পারো প্রায় ছুটতে ছুটতে কফি শপে গেল, কিন্তু একই ? ওদের সেই টেবিলে শিখা তখনো বসে আছে আর ওর চেয়ারের পেছনে ওর ব্যাগটা ঠিক সেই ভাবেই রয়েছে। ঠিক যেমন পারো রেখে গিয়েছিল।

"একি তুই এখনো বসে আছিস? তোর না কোথায় যাবার ছিল।"

"হ্যাঁ যাবো। তোমার ফেরার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।"

"এতক্ষণ? তোকে তো কখন ফোন করে চলে যেতে বলেছিলাম?"

"কোথায় ফোন? এই তো দশ মিনিটও হয়নি। চলে যাবো কেন?"

পারোর মাথাটা ঝম ঝম করে উঠলো। ও ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো। "দশ মিনিট? কি বলছিস তুই? তোর কি সময়ের কোনো জ্ঞান নেই?"

"কি বলছো পারো দি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি টয়লেটে গেলে, ব্যাগ রেখে গেলে আর ফিরে এলে। এইটা নিয়ে এতো প্রশ্ন করার কি আছে?"

"তোর ফোন দেখ, আমার কল আছে।"

"পাগল হয়ে গেছো।" শিখা ফোন বার করলো। "দেখো, কোনো কল নেই। তোমার লাস্ট কল সেই সকালে । বেরোনোর সময়। তারপর কল লিস্ট ফাঁকা।"

"শিখা , একটা ভয়ানক কিছু হয়ে গেছে।"

"কি?"

"আমায় বাড়ি নিয়ে চল, বলছি।" পারো বুঝতে পারছিল, ওর ভেতরের কোথাও একটা দরজা খুলে গেছে -- না জানি কিসের দিকে, কার আহ্বানে ।

 যন্ত্রজালের ফাঁদ

পরের দিন সকাল ।

ভোরের আলো ফোটার অনেক আগেই পারোর ঘুম ভেঙে গেছে। একটু এদিক ওদিক উশখুশ করতে করতে পারো বুঝতে পারলো যে ওর পাশে শুয়ে থাকা ক্রয়েরও  একেই অবস্থা। গতকালের ঘটনার পর পারো কিছুটা  মানসিক দিক থেকে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। নিজের অজানতেই সে পাশ ফিরে ক্রয়ের খালি দেহটা জড়িয়ে ধরে নিজেকে ওর দিকে টেনে নিল। ক্রয়ের কাঁধে মাথা দিয়ে শুয়ে, নিজের খালি পিঠে ক্রয়ের হাতের ছোঁয়াটা যেন তাকে কিছুটা ভরসা দিল। 

সিফিলিস নিয়ে ঘরে আসার পরেই পারো, ওর লম্পট আর জালিয়াত স্বামীকে বাড়ি আর জীবন, দু জায়গা থেকেই  গলা ধাক্কা দিয়ে বার করে দিয়েছিল। খালি জীবনটাকে ভরিয়ে রাখার জন্যে  নিজের উদ্যোগে চার্টার্ড একাউন্টেন্সি পাস করে। তারপর যখন জেমিনি কন্সালটিংয়ে ফরেনসিক একাউন্টেন্ট পদে  আমন্ত্রিত হয়েছিল তখন সে ভেবেছিল যে এইবার সে তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাকি জীবনটা ভাল ভাবে কাটিয়ে দেবে। কিন্তু ছেলে, বাবার ধারা পেয়েছিল । বিদেশে পড়তে গিয়ে ড্রাগ আর নানা রকম কুকাজে জড়িয়ে পড়ে সেই ছেলেও ওর জীবন থেকে বহুদিন হলো হারিয়ে গেছে। 

স্বামীর কুকীর্তি ধরা আর প্রমাণ করার পেছনে তখন অচেনা ক্রয়ের অসাধারন হ্যাকিংয়ের এক বিরাট  অবদান ছিল। ক্রয়ের খুঁজে বার করা  অকাঠ্য প্রমাণ  পারোর ডিভোর্সের পথ এতটাই মসৃন করে দিয়েছিল যে পারো তার ছেলের বয়েসী ক্রয়ের প্রেমে পড়ে যায়। এদিকে ক্রয়, ছোট বেলায় নিজের মাকে হারিয়ে আর বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে বিশেষ পাত্তা পেত না। তাই সে পারোর ডাকে সাড়া দিয়ে পারোকে আঁকড়ে ধরেছিলো,  কিছুটা দিদির  আর কিছুটা প্রেয়সীর ধারণায়। তাদের রিলেশনশিপ টা ছিল, যাকে  বলে সত্যি সত্যিই কমপ্লিকেটেড ! পারোর জীবনে  ক্রয়,  তার স্বামী আর ছেলে, দুজনেরই জায়গায় খুব নিখুঁত ভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিল । বাইরের জগতের কাছে তারা অফিস কলিগ, কিছুটা দিদি-ভাই, কিন্তু পারোর ফ্লাটের ভেতরে আর শোবার খাটে তারা অনেক নিবিড়, অনেক ঘনিষ্ঠ। তাদের এই ব্যাপারটা অবশ্য  শিখা জানতো,  আর জানতো জেমিনি কন্সালটিংএর কর্ণধার অশোক বাবু ওর তাঁর স্ত্রী নবনীতা । এই দুজনের  উদ্যোগে আর উৎসাহে পারো নিজের মুক্তির পথ নিজেই খুঁজে  নিয়ে এখন কর্পোরেট সার্কেলে  একটা গন্যমান্য  জায়গায় পৌঁছেচে । বোর্ডরুম থেকে পুলিশ কমিশনারের অফিস, সব জায়গাতেই এখন তার প্রবেশ অবাধ।

হ্যাকাররা যেমন হয়, ক্রয়ও ঠিক সেরকম। কম্পিউটার নিয়েই তার জীবন -- মেশিন নিয়েই সারাদিন পড়ে থাকতে সে ভালোবাসে। মানুষের সঙ্গে, বিশেষ করে মেয়েদের  সঙ্গে তার বোঝাপড়া একটু কম এবং আচরণও কিছুটা আড়ষ্ট। তবে তার শরীরে  যৌবনের জোয়ারের কোন কমতি নেই। আর সেই জোয়ারে উপছে  ওঠা কামোচ্ছ্বাস কে পারো সামাল দেয় । কিন্তু এই সম্পর্কটা শুধুই দেহভিত্তিক  নয়। পারো ক্রয়ের কাজের যথেষ্ট মর্যাদা দেয়,  আর ব্যক্তিগত ভাবেও তাকে খুবই ভালোবাসে। 

কিন্তু পারোর দিক থেকে এই ভালোবাসাটা  আর একটু  বেশি জটিল। ছেলের বয়সী এক সহকর্মীর  সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়ায় যেমন একরকম মাদকতা আছে, তেমনি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তিও থেকে যায়। কিছুটা আগুন নিয়ে খেলার মতো। তবু নিজের ওপর পারোর  এতটাই আস্থা, এবং কাজে তার এতটাই  সুখ্যাতি যে এসব আর তাকে খুব একটা ভাবায় না। নিজেই নিজের পথ বানিয়ে সে এগিয়ে চলে। কে কি বললো সে ব্যাপারে তার খুব একটা মাথাব্যথা নেই।

কিন্তু আজ সারা রাত  ধরে পারো নিজেকে বড়োই অসহায় মনে করছে। কী  করে তাকে বোকা বানিয়ে, কারা  তাকে কোথায় নিয়ে গেল। তারপর একেবারে উলংগ করে দিল?  কে? কেন? নাকি সবটাই মনের ভুল? কি করে? এই সব ভাবনা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সে ক্রয়কে আরো নিবিড় করে জড়িয়ে ধরলো।

"ক্রয়, জেগে আছিস?"

"হুঁ। আর ভাবছি।"

--------------------------------------------------

আসলে গতকাল দুপুর থেকেই ওরা তিন জন এই নিয়ে ভাবছে আর ভেবে কুলকিনারা করে উঠতে পারছেনা। শিখার সঙ্গে দেখা হবার আগে অবধি পারো একটা মোহময় জগতে বিচরণ করছিল। রানার সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় অস্বস্তিকর অবস্থাতে কাটালেও, ব্যাপারটার মধ্যে তাও একটা অদ্ভুত মাদকতা ছিল। অচেনা লোকের সঙ্গে অকস্মাৎ শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াটা খুবই অস্বাভাবিক আর  নিশ্চয়ই বিপদজনক কিন্তু অসম্ভব নয়। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে এটা হতেই পারে। কিন্তু সে যখন এই লম্বা দু-তিন ঘন্টা অভিসারের পর, ফিরে এসে দেখলো, বা বুঝতে বাধ্য হলো, যে আসলে, বা আপাতত দৃষ্টিতে সে শুধু মিনিট দশেক শিখার চোখের আড়ালে ছিল তখন তার মাথাটা একেবারে ঘুরে গেল। পারো আর শিখা, দুজনের ঘড়িতেই মাত্র দশ মিনিট পেরিয়েছে, আর কারুর ফোনেরই  কল রেকর্ডে কোনো ফোন করার বা ধরার লেশমাত্র চিহ্ন নেই। এটা কি করে হয়?

"তুমি ভুল করছো পারো দি। এটা তোমার মনের ভুল, হ্যালুসিনেশন  ছাড়া আর কিছুই নয়।"

"আমি হটাৎ এতটাই হ্যালুসিনেট করবো? কেন? আমি কি ড্রাগ খেয়েছি?"

"শরীর খারাপ হতে পারে, পেটে গ্যাস, অম্বল। মাথা ঘুরে যেতে পারে।"

"তাহলে পড়ে যাবো, আঘাত লাগবে, কেউ টেনে তুলবে। সেগুলো তো মনে থাকবে। এতকথা, এত ঘোরাঘুরি সব মনে আছে যে  টয়লেটে পড়ে যাওয়াটা মনে থাকবে না?"

"শরীর  অসুস্থ হলে সব কিছু মনে থাকে না।"

"মানছি। পড়ে যাওয়া, জ্ঞান হারিয়ে ফেলাটা মনে না থাকতে পারে। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর, উঠে বসা, টয়লেট থেকে বেরুনো সেগুলো তো ভুলে যেতে পারিনা।"

"তাহলে তো এটা স্বপ্ন দেখার মতো ব্যাপার হয়ে গেল। ঘুমের মধ্যে তুমি কোথায় না কোথায় ঘুরে এলে আর তার  পর দেখলে যে তুমি নিজের খাটেই  শুয়ে আছো।"

"যাকে  বলে ভিভিড ড্রিম। কিন্তু  মুশকিল হচ্ছে যে লোকে খাটে  শুয়ে ঘুমোয়। হোটেলের টয়লেটের মধ্যে কেউ ঘুমিয়ে পড়ে না।"

"ডে ড্রিমিং? যাকে বলে কল্পনার জগতে  হারিয়ে যাওয়া ?"

"কিন্তু এত ভিভিড? আর পারো দি আগে তো এরকম তোমার কখনো হয়নি? আজকে কেন? " ক্রয়ের মনে হটাৎ এই চিন্তা তা এল। "আর আজকেই তোমার ঐখানে একটা আমন্ত্রণ ছিল।"

"আমার হয়নি, কিন্তু বাকি যারা এইরকম আমন্ত্রণ পেয়েছিল, তাদেরও কি এইরকম হয়েছিল?"

"কেউতো ঠিক খোলসা করে কিছু বলেনি। বলে না।"

"হ্যাঁ ব্যাপারটা খুব বোকা বোকা । আমার নিজের না  হলে আমিও বোকা বলতাম। অবিশ্বাস করতাম। কিন্তু এখন নিজের গায়ে ফেলে দেখছি  ... তাই আর অবিশ্বাস করতে অসুবিধে হচ্ছে।"


এই নিয়ে কথা বলতে বলতে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল, কিন্তু কোনোদিক দিয়েই কোনো সুরাহা হচ্ছে না।

শিখা আর ক্রয় রীতিমত জেরা করে চলেছে।

"আচ্ছা বাথরুমে আর কেউ ছিল?"

"হ্যাঁ ছিল। যেমন থাকে । আয়া । ক্লিন করে। কিন্তু আমি তো স্টলের ভেতরে । দরজা ল্যাছ করা।"

"ঠিক কি হলো ?"

"আমি প্যান্ট নাবিয়ে টয়লেটে বসেছি। আলোটা দপ করে নিভে গেল, অ্যালার্ম বেজে উঠলো। তার পরেই আবার সব ঠিক। যেমন ছিল তেমন।"

"তারপর?"

পারো আবার পুরো ঘটনা বিস্তারিত ভাবে বললো। বাথরুমের বাইরে, করিডোরে রানা বসের সঙ্গে দেখা, লাউঞ্জে গিয়ে মার্টিনি খাওয়া, তারপর  বেসমেন্টের ভেতর দিয়ে 'অচেনা' নাইটক্লাব আর তারপরে সেই পাতালপুরীর শপিং মল । শেষে গিয়ে নব-নীরের ভেতরে এক সুপুরুষ ছেলের সঙ্গে  ..  

"যোগব্যায়াম?" শিখা ফিক করে হেসে ফেললো।

"এই শিখা, তুই একদম ঠাট্টা করবি না। তুই হলে তো   ... "


ঘটনা যাই হোক না কেন,  পারো পুঙ্খানুপংখ ভাবে  তার  নিখুঁত বিবৃতি দিয়ে গেল। কোনো বিস্মৃতি নেই, কোনো বিভ্রান্তি নেই, স্বচ্ছ সরল ভাবে  গড়গড় করে। ঠিক যে ভাবে সে দেখেছে।

"সবই তো বুঝলাম, কিন্তু আদৌ এই ঘটনা ঘটেছিল? সেটা কিন্ত এখন প্রমাণিত নয়।"

"ঘটেছিল, ঘটেছিল। তুই আমায় এতটা গাধা ভাবিস না,  ক্রয়।"

"না, না, আমি সব দিক থেকে ব্যাপারটা দেখার চেষ্টা করছি।"

শিখার ফোনটা বেজে উঠলো । ও একটু দূরে গিয়ে কথা বলে ফিরে এল । "তুষারকে একটা খোঁজ নিতে বলেছিলাম," তুষার হলো শিখার প্রাক্তন  সঙ্গী, পুলিশে কাজ করে। একসময়ে একেবারে রাধা-কৃষ্ণ জুটি, দিঘায় রাত কাটাতো। কিন্তু তুষার পার্টির ঘোলাটে ব্যাপারে  জড়িয়ে পড়ায় শিখা ওর থেকে সরে  এসেছে। তবুও সে এখনো শিখার ভক্ত, কিছু করতে পারলে মুগ্ধ হয়ে যায়।  "ও বললো যে আজকে দুপুরের আগে রাজ বেঙ্গল হোটেলের লাউঞ্জে কেউ মার্টিনি খায় নি। হুইস্কি রাম অনেকেই খায়, কিন্তু  কেউ মার্টিনি চাইলে সেটা  বার টেন্ডারের নিশ্চয় মনে থাকতো।"

"তার মানে আসলে ব্যাপারটা ঘটেনি। হ্যালুসিনেশন? না ইলিউশন? না কি স্বপ্ন?"

"আসল মানে কি? কোনটা আসল? কোনটা নকল ? নাকি সবকিছুই মায়া ?"

"তত্ব কথা ছাড়। যদি হ্যালুসিনেশনই হয়, তাহলে হটাৎ হলোই বা কেন?"

"ক্রিস্টোফার নোলানের ইনসেপশন সিনেমাটা মনে আছে? কিরকম ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। একেবারে ইঞ্জেকশান করে ব্লাড স্ট্রিমে । আর লোকে সেই স্বপ্ন দেখছিল।"

"ওটা একেবারে গাঁজাখুরি। রক্তের সঙ্গে স্বপ্নের কোনো যোগ থাকে না। থাকতে পারে না।"

"কিন্তু ড্রাগ খেয়ে তো নানা রকম হ্যালুসিনেশন হয়।"

"দ্যাখ, তোরা যতই প্রমান করার চেষ্টা করিস না কেন, ওটা আমার হ্যালুসিনেশন নয়।"

"কিন্তু সেটা প্রমান করবো  কি করে?" আর বলতে না বলতেই প্রমাণ চলে এল । কিন্তু একি ? এ কিসের প্রমাণ ?

পারোর দ্বিতীয় ফোনটা, মানে যে নম্বর দিয়ে নিশিগন্ধার মত দু নম্বরি আইডি তৈরী করে, সেটাতে টিং করে একটা নোটিফিকেশন এলো । কালদর্পন হ্যান্ডলে নতুন ছবি পোস্ট হয়েছে।

"এ মা! আমার দুপুরের ছবি পোস্ট করে দিয়েছে।"

ঠিক তাই। পারোর বেশ কয়েকটা রগরগে ছবি জলজল করছে কালদর্পণের ইন্সটা টাইমলাইনে। রাজ বেঙ্গলের লাউঞ্জে হাতে মার্টিনি তুলে  চিয়ার্স করছে। তারপর সেই শপিং মল । একটা সুসজ্জিত দোকানে  নানারকম ব্যাজ, ইউনিফর্মের, বাটন ভর্তি কাঁচের শোকেসর  সামনে , একটা বেশ কায়দা করে তোলা  ছবি। ছোট্ট  স্লিভলেস ক্রপ-টপ ড্রেস আর জিন্স পরে,  টিন এজারদের মত কোমর বেঁকিয়ে, হাওয়ায় কিস দিচ্ছে। আর তারপর তো সেই ভয়ঙ্কর বন নীরে যোগব্যায়াম। কি ভাগ্যি সেখানে মুখটা একটু আড়াল করা, কিন্তু বাকি শরীরের অনেকটাই অনাবৃত আর দেখা যাচ্ছে না। সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ম মেনে যতদূর পর্যন্ত দেখানো সম্ভব, ততটাই খোলা। সঙ্গের যুবকটিরও মুখটা পুরোটা দেখা না গেলেও, পারো যে তার সঙ্গে বেশ জড়াজড়ি করে রয়েছে সেটা ভালোই বোঝা যাচ্ছে।

"এবার কি হবে?"

"কি আবার হবে? নিশিগন্ধা যে পারো সেটা কারুর জানার উপায় বা দরকার নেই।" পারো ব্যাপারটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিল না।

"আর হলেও তো কি? এমন তো নয় যে ফুল ফ্রন্টাল নুডিটি বা পর্নোগ্রাফিক। এইটুকু দুষ্টুমি আমাদের পারো দি করতেই পারে।” শিখা হেসে ফেললো। “আর করে না, এমন তো নয়।"

"কিন্তু এই ছবিতে তোদের হ্যালুসিনেশন বা স্বপ্ন দেখার থিওরি ভেসে গেল। অকাট্য প্রমাণ যে আমি কোথাও গিয়েছিলাম।"

"কিন্তু ঘড়িতেও অকাট্য প্রমাণ বলে যে তুমি কোথাও যেতে পারো না।"

কিন্তু এই দুটো  পরস্পরবিরোধী অকাট্য প্রমাণ কি একে অপরকে খণ্ডন করতে  পারবে? না কি  সেটা অসম্ভব?

এই দোলাচলের মধ্যেই গতকালের তাদের রাতের অধিবেশন শেষ হয়। শিখা বাড়ি চলে যায়, কিন্তু ক্রয় পারোর কাছেই থেকে যায়।

--------------------------------------------------

পারো প্রথমে ভেবেছিল যে সেদিন  আর অফিস যাবে না, কিন্তু সারাদিন একা বসে এই ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করাটাও বেশ কষ্টকর । বৃথা চিন্তা, সদুত্তর পাওয়া শক্ত, খুবই শক্ত। অফিসে এটা ওটা করার ফাঁকে পারো শিখাকে একবার ফোন করেছিল। বললো আজ সন্ধ্যে বেলা আসতে । ক্রয়কেও ফোন করেছিল কিন্তু সে ফোন ধরেনি।  ইনস্টাগ্রামে পারোর যে ছবিগুলো গতকাল পোস্ট করা হয়েছিল, সেগুলো চেয়ে পাঠিয়ে সে  হঠাৎ দুপুরের  একটা মেসেজ করেছিল যে। পারো সেগুলো পাঠিয়ে দেওয়াতে তার ওপর একটা থামস আপ ইমোজি মেরে প্রাপ্তিস্বীকার করেছে। আর কিছু নয়। দেখা যাক, বাড়ি ফিরে কোনো আশার  আলো দেখা যায় কি না।

পারোর একটা মাহিন্দ্রা থর গাড়ি আছে, যেটা ও আর শিখা বদলে বদলে চালায়। আজ শিখাই চালিয়ে ওদের সেক্টর ৫ এর  অফিস থেকে ফিরছে।

"আজ ছোট বাবুর  কি খবর?"

"সে আজ বাড়ি থেকে বেরোয় নি। মাঝখানে আমার ইন্সটার ছবি গুলো চেয়ে নিল। তারপর সব চুপচাপ।"

বাড়ি পৌঁছে  লিফটের কাছে ক্রয়ের রয়াল এনফিল্ড মিটিওর ৬৫০ টা দেখে বুঝলো যে সে এসে গেছে। ওর কাছে পারোর ফ্ল্যাটের চাবি থাকে তাই দুই মহিলা ঢুকে দেখলো যে সে ইতিমধ্যেই নিজের ব্যবস্থা করে নিয়েছে। বিয়ারের ক্যান খোলা, বোস স্পিকারে ভেসে আসছে ইউরোপিয়ান চেম্বার মিউজিকের গমগমে আওয়াজ।

"এক্ষুনি চালালি?"

"হ্যাঁ । কি করে বুজলে?"

"অলসো স্প্রাখ জারাথুস্ত্র র সবে সানরাইস পর্ব চলছে।" পারো মুচকি  হাসলো। ২০০১ স্পেস ওডেসিতে ব্যবহৃত স্ট্রাউসের এই বিখ্যাত সাউন্ডট্র্যাক, ক্রয়ের খুব পছন্দ। মন ভালো  থাকলে বাজায় । "মনে হচ্ছে কোনো ভাল খবর দিবি ।" 

"একটা আনুমানিক চিত্রনাট্য খাড়া করেছি। কিছুটা বাস্তবভিত্তিক অনেকটাই কলপনা।" ক্রয়ের ঠোঁটে এক রহস্যজনক হাঁসি। "তোমরা যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো। বোঝাতে সময় লাগবে।"

আধ ঘন্টা পরে সকলে রেডি হলে ক্রয় শুরু করলো । "আমি ছবি গুলো খুঁটিয়ে দেখলাম, এগুলো কোনোটাই ন্যাচারাল অপটিক্যাল ছবি নয়।"

"তার মানে?"

"মানে এগুলো সাধারণ ক্যামেরা বা ফোনে আমরা যেমন ন্যাচারাল লাইটে ছবি তুলি  সেরকম নয় । সেখানে ক্যামেরার CCD বা CMOS সেন্সরে আলো পড়ে ডিজিটাল JPEG ইমেজ তৈরী হয়। তারপর  ড্রাইভে থেকে  যায়। এখানে একেবারে অন্যরকম।"

“এত টেকনিক্যাল কচকচি বুঝি না।

“বুঝতেই হবে। এটা ২১এর শতাব্দী। অপরাধী আর গোয়েন্দা দুজনেই প্রফেসর শংকু আর ব্যোমকেশের জগৎ পেছনে ফেলে চলে এসেছে।”

“তাই বলে এত কঠিন সব ব্যাপার?”

“ভালো না লাগলে তোমরা ফিরে গিয়ে সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা বা কোনান দোয়েলের হাউন্ড অফ বাস্কেরভিল্স পড়। কিন্তু কালদর্পণ বুঝতে গেলে ধৈর্য ধরে শুনতে ( আর পড়তে!) হবে ।

"ঠিক আছে, ঠিক আছে। আর জ্ঞান দিতে হবে না। বল এখানে কি ভাবে ছবি তোলা হচ্ছে? "

"অনলাইন গেমের কথা তোমরা নিশ্চয় শুনেছ।"

"হ্যাঁ । ফার্স্ট পার্সন শুটার গেম যেমন কাউন্টার স্ট্রাইক, কল অফ ডিউটি। মারামারির খেলা।"

"আবার ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং গেম যেমন ওয়ার্ল্ড অফ ওয়ারক্রাফ্ট অথবা ফাইনাল ফ্যান্টাসি । বহু লোক একসঙ্গে লগইন করে একে অপরের সঙ্গে কথা বলে, খেলা করে, কাজও   করতে পারে।"

"আর এই ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং গেমের ভেতরে নানা রকম দৃশ্যপট তৈরী করা যায়। যেমন ধরো জঙ্গল, পাহাড়, সমুদ্রের তলা । আবার ঘর বাড়ি দোকান কারখানা।"

“সিনেমার সেটের মতো?”

"হ্যাঁ কিন্তু সবই ভার্চুয়াল, আসল নয়। আর যারা এই গেম খেলছে, তারা এই কৃত্রিম দৃশ্যপটের মধ্যে দিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে। একে অপরকে দেখতেও পারে।"

"এদেরই কি অবতার বলে?"

"একদম ঠিক। সনাতন ধর্মে আছে ভগবান বিষ্ণু বৈকুণ্ঠলোক থেকে মানব লোকে  অবতার হিসেবে অবতরণ করেন। আর ঠিক সেই ধারণাটাই এখন ডিজিটাল গেমের জাগাতে ঢুকে গেছে। যে সব মানুষ গেম খেলছে, গেমের ভেতরে তাদের দেখা যায় তাদের অবতারের রূপে।"

"এটাকি সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলের মত?"

"কিছুটা তো বটেই, যেমন তোমাকে,  মানে আসল পারো কে,  ইনস্টাগ্রামে দেখা যায় নিশীগন্ধার মধ্যে। কিন্তু গেমের অবতার অনেক বেশি বাস্তবিক। শুধু একটা নাম নয়? পুরো চেহারা। হাত পা মুখ মাথা সব দেখা যায়।"

"মানে আমার একটা ভিডিওর মত ?"

"সেটা নির্ভর করে গেম মেকার আর খেলোয়াড়ের ওপর। কিছু লোক নিজের চেহারার মতো অবতার করে, আবার কিছু লোক ভূত, পেত্নী, দানব, জন্তু, অথবা কোনো কাল্পনিক বস্তুর মত নিজেকে দেখায়।"

"তাহলে আমরা তিনজনে, তিনটে অবতার তৈরী করে, গেমে প্রবেশ করে -- লগইন করে --  লাফালাফি করতে পারবো।"

"নিশ্চয় পারবে।"

"আর একে ওকে দেখতে পাবো?"

"খালি নিজেদের কেন? যত লোক সেই মুহূর্তে গেম খেলছে -- লগড ইন রয়েছে -- তারা সকলেই সকলকে দেখতে পারবে।"

"আর শুধু দেখবে কেন? তাদের ছবি তুলবে!"

"কি করে? স্ক্রিন শট নিয়ে?"

"আরে না না, সেটা খুব কাঁচা কাজ হয়ে যায়। সেটা হবে গেম প্লেয়ার স্ক্রিনে যা দেখছে সেইটা। যেকোন গেমের মধ্যে ফটো-মোড থাকে তাই দিয়ে খুব স্বাভাকি ছবি তোলা যায়। সেটা হবে অবতার গেমের ভেতরে যা দেখছে সেইটা।”

“পার্সপেক্টিভ পাল্টে যাবে। অবতারের দৃষ্টিকোণ থেকে ছবিটা উঠবে।”

“একে ছবি তোলা বলা যায় না। ছবি নয় -- যেন চেতনার প্রতিধ্বনি, যেন তোমার ছায়া আর তোমার অবতার, দুটোই একই সাথে অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে আছে।"

"তাহলে এরকম করেই ছবি তুলেছে?"

"ছবি এরকম ভাবেই তুলেছে বা তৈরী করা হয়েছে, কিন্তু তার আগে একটা আরো বড় রহস্য আছে।"

"হ্যাঁ, পারো দি এই গেমে ঢুকলো বা লগইন করলো কখন? বা কিভাবে?"

"ঠিক ধরেছিস শিখা। এইখানেই ব্যাপারটা খুব ঘোলাটে হয়ে যায়। লগইন করতে একটা মেশিন লাগবে। ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, প্লেস্টেশন অন্তত একটা মোবাইল ফোন। যে খেলছে, তাকে গেমের সঙ্গে একটা যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। সে স্ক্রিনে দেখবে অন্য অবতাররা কি করছে আর কীবোর্ড অথবা মাউস দিয়ে নিজের অবতারকে নাড়াবে বা কাজ করাবে।"

"কিন্তু এখানে তো আমি কোনো স্ক্রিন দেখিনি, অথবা কোন কিবোর্ডে হাত লাগাই নি? তাহলে আমি এই গেমে ঢুকে গেলাম  কি করে?"

"এখান থেকেই ব্যাপারটা খুব ঘোলাটে, বা অবাস্তব মনে হতে পারে। ধৈর্য ধরে শুনতে হবে।"

"তাহলে কি আমরা এবার বিয়ার ছেড়ে আরো শক্ত কিছু ধরবো?" শিখা হাসলো।

"ধ্যাৎ কি সব বলিস। ছন্দে পতন।"

"আমি বলছিলাম বিয়ার ছেড়ে বাকার্ডি রাম ধরতে হবে কি না!"

"মেশালে আবার মাথা ঘুরে পড়ে যাবি না তো?"

"এটা একেবারে ভুল ধারণা। ড্রিঙ্কস মেশালে কিস্যু হয় না। দাঁড়াও নিয়ে আসি।"

"এই আমারটায় কোক দিবি  না।  লাইম জুস আর একটু চিনি।"

"উঃ ডাইকিরি? আমারটাও তাই করে দে।"

শেষ অবধি তিনটে বড় ডাইকিরি নিয়ে আবার বিশ্লেষণ শুরু হলো।

"কীবোর্ড বা স্ক্রিন ছাড়া পারো দি কিভাবে এই গেমের ভেতর প্রবেশ করলো?"

"তবে শোন, বেশ কিছুদিন হল একটা নতুন টেকনোলজি বেরিয়েছে। থট কন্ট্রোল। হাত দিয়ে কিবোর্ড টিপে বা কারসার নাড়িয়ে যা করা যেত, সেইটাই এখন শুধু চিন্তা করেই হবে।"

"মানে আমি ভাবলাম যে A টিপবো  আর স্ক্রিনে A ফুটে উঠবে, আমায়  কিবোর্ডে হাত দিতে হবে না।"

"সত্যিই এরকম হয়? নাকি গুলপো মারছিস?" শিখার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। সে এমন ভাবে মাথা নাড়াচ্ছিল যেন মনে হচ্ছে ওর ব্যাপারটা বিশ্বাসই হচ্ছে না।

"বিশ্বাস করো, এটা  হয়। আমি তোমায় তিনটে কোম্পানির নাম দিতে পারি যারা এই যন্ত্র বাজারে বিক্রি করে।"

"কি রকম যন্ত্র?"

"এক হয় টুপির মতো, মাথায় পরে নিতে হয় আর তার থেকে আরো ভালো হচ্ছে হাতে, মানে কব্জিতে,  বালার  মতো।”

“হাতের বালা ? তা থেকে কি করে আমার মনের কথা বোঝে?”

“ কীবোর্ড টিপতে বা মাউস নাড়াতে হাতের যে মাসল, বা স্নায়ু, গুলো স্বক্রিয় হয়ে ওঠে, সেগুলো কে চিহ্নিত করে,  তুমি কি করতে চাইছো সেটা বুঝে নেয়।"

"ঠিক আছে, মানলাম। কিন্তু এটা তো ইনপুট। মানে মানুষ থেকে মেশিনে ডেটা যাচ্ছে। ডেটা ফিরছে কি করে?"

"ঠিক ধরেছিস শিখা । স্ক্রিনে যা দেখা যাচ্ছে সেটা দেখতে হলে তো একটা স্ক্রিনের সামনে বসতে হবে।"

"কিন্তু আমার সামনে তো কোনো স্ক্রিন ছিল না।"

"এইবার আর একটা টেকনোলজির কথা বলতে হবে। বায়োনিক আইজ।"

"কত কি যে শিখতে হবে! বল সেটা আবার কি?"

"আমার যখন কিছু চোখে দেখি, তখন চোখের রেটিনাতে আলো পড়ে । চোখের ভেতরে রড আর কোন নামের কোষ আছে।”

“তুই কি আমাকে বায়োলজি পড়াবি ?”

“বুঝতে হবে, নয়তো রূপকথার মতো শোনাবে।”

“ঠিক আছে, ঠিক আছে বল।”

“হ্যাঁ । এই চোখের ভেতরের কোষগুলো  আলোর শক্তি কে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে সেই বৈদ্যুতিক সিগন্যাল মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেয়।"

"তারপর?"

"আমাদের মস্তিষ্কে সেই বৈদ্যুতিক সিগন্যাল থেকে আমাদের দৃষ্টি হয়, আমরা জগৎটাকে দৃষ্টির ভেতর দিয়ে অনুভব করি।"

"এটা আমাদের চোখের কোষের মাহাত্ম্য।"

"এখন ধরো চোখের কোষগুলো অকেজো হয়ে গেছে, তাহলে এই আলোর রশ্মি থেকে বৈদ্যুতিক সংকেত আর বেরোয় না। আমরা অন্ধ হয়ে যাই । কিন্তু  ...

"কিন্তু কি?"

"যদি কোনো কম্পিউটার  থেকে, আলো নয় , একেবারে বৈদ্যুতিক সংকেত যদি চোখ কে পাশ কাটিয়া, সরাসরি মস্তিষ্কের ভেতরে  পৌঁছে দেওয়া যায় তাহলে মানুষ চোখ ছাড়াই সেগুলো দেখার অনুভূতি পাবে। একেই বলে বাইয়োনিক চোখ বা বাইয়োনিক আই ।"

"তার মানে কম্পিউটার থেকে সিগন্যাল বা সংকেত স্ক্রিনে না গিয়ে সোজাসুজি মস্তিষ্কে চলে যাচ্ছে আর মানুষ স্ক্রিনে যা দেখতে পেত, মানে ঘর বাড়ি, পাহাড় পর্বত, শপিং মল সবই দেখছে।” 

“কিন্তু এক্ষেত্রে স্ক্রিন বা চোখ ছাড়া।"

"ওরে বাবা এতো সাংঘাতিক। থট বা চিন্তা দিয়ে কম্পিউটার কন্ট্রোল করা আর স্ক্রিন ছাড়াই স্ক্রিনে যা দেখা যেত  সেইটাই  মনের মধ্যে সোজাসুজি অনুভব করা। এত কল্পবিজ্ঞান।"

"না। এগুলো সবকটাই আজকে সম্ভব, এই প্রযুক্তি ভিত্তিক যন্ত্র আজ বাজারে পাওয়া যায়। কিন্তু এর পর যেটা বলবো, সেটাকে কল্পবিজ্ঞান বলতে পারো।" ক্রয় এত  কিছু বোঝাতে বোঝাতে হাঁপিয়ে যাচ্ছিল। 

আর পারো আর শিখার ও অবস্থাও বেশ খারাপ। এত জটিল সব ব্যাপার মাথায় রাখা সহজ নয়।  "আমাদের আর এক রাউন্ড ডাইকিরি দরকার।"

শিখা আবার ডাইকিরি নিয়ে এলো। সকলে দু এক চুমুক দেওয়া হল। 

"ক্রয়ের এতো কথায় মাথা ঝিম ঝিম করছে। এ শুধু বাকার্ডির কাজ নয়।"

"নিকোটিন দিয়ে একটু হাওয়া না করলে মাথার এই ট্র্যাফিক জ্যাম খুলবে না ।" পারো উঠে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালো । "চল একটু বারান্দায় ঘুরে আসি।"

ধোঁয়ার পর্ব শেষ করে, ডাইকিরি ঢকঢক করে গলা দিয়ে নামিয়ে কিছুটা ফুরফুরে মন নিয়ে পারো আর শিখা আবার ক্রয়ের ব্যাখ্যা শুনতে  লাগলো।

"এই পর্যন্ত সব প্রমাণিত প্রযুক্তি। এখন আসছে সেই জায়গা, যেখানে প্রমাণ আর অনুমানের সীমারেখা মিলেমিশে যায়। আমার কথাগুলো একটু অসংলগ্ন লাগতে পারে।”

“বড় জটিল।”

“ একটু ধৈর্য ধরে শোনো আর একটু আধটু ভুল ভ্রান্তি থাকলে মাফ করে দিয়ো। ব্যাপারটা খুব জটিল। "

"দাঁড়া। নতুন কিছু বলার আগে একটু বুঝে নিই আমরা ঠিক কোথায় রয়েছি।"

"যা বুঝলাম, এই কালদর্পন আর রানা এরা পারোদিকে একটা সিমুলেশন গেমের ভেতর নিয়ে গেছে। সেখানে পারো দি লাউঞ্জ বারে  বসে মার্টিনি খেয়েছে, পাতালপুরীতে শপিং মলের সামনে নৃত্য করেছে আর তার পর একটা সুপুরুষ ছেলের সঙ্গে। .."

"এই চুপ! কোনটাই করিনি, করার অনুভূতি অনুভব করেছি।"

"কিন্তু এখনো দুটো বিষয়ে ধোঁয়া আছে।"

"সিমুলেশন গেমে যতই থট কন্ট্রোল আর বায়োনিক চোখ থাক, সেগুলো তো পারো দি কে নিজে শরীরে লাগাতে হবে। নিউরাল ক্যাপ মাথায় পরতে হবে বা নিউরাল ব্রেসলেট হাতে লাগাতে।"

"আর বায়োনিক চোখটাও শরীরের কোথাও একটা লাগাতে হবে। আমায় না জানিয়ে, সম্মতি না নিয়ে সেগুলা কি করে চালু হয়ে গেল?"

"ঠিক ধরেছো দিদি। ঠিক এই নিয়েই আমি সকাল থেকে লেগে আছি আর যা বেরিয়েছে সেটা শুনলে তোমার গায়ে কাঁটা দেবে। নন-কনসেন্সুয়াল মাইন্ড ইন্টারফেস।”

“নন-কনসেন্সুয়াল সেক্স শুনেছি। তাকেই রেপ বলে।”

“কিছুটা সেইরকম। তুমি জানতেও পারবেনা কিন্তু তোমার মনের সঙ্গে কম্পিউটার প্রগ্রামের একটা সরাসরি যোগাযোগ তৈরী হয়ে যাবে। একে বলা যেতে পারে নিউরো ফেজ লিংকেজ সিস্টেম।"

"ঠিক কি করে হবে?"

"নিউরো ফেজ লিংকেজ সিস্টেমের তিন চারটে ধাপ, বা স্তর,  আছে। প্রথম ধাপ হলো ট্রান্সক্রেনিয়াল ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড।”

“হাসপাতালে যেমন USG করে, এটা কি সেই রকম একটা শব্দ? যেটা কানে শোনা যায়না।”

“হ্যাঁ কিন্তু এখানে সেই শব্দ দিয়ে ব্রেনের থ্যালামাস  আর হিপোক্যাম্পাস এর মধ্যে একটা  শিহরণ আর অনুরণন তৈরী করে।”

"আর আমরা জানতেও পারি না।"

"তারপর ডিস্কোর মতো স্ট্রবস্কোপিক আলোর ঝিলিক, যাকে বলে ফোটোনিক লাইট স্টিমুলেশন। চোখের ভেতর দিয়ে ঝিকিমিকি সিগন্যাল পাঠিয়ে ব্রেনের ভিসুয়াল কর্টেক্সে ছোট্ট করে খোঁচা দেয়।  সেই সঙ্গে একটা আওয়াজ।"

"হ্যাঁ আমি বাথরুমে এইরকম আলো দেখেছিলাম আর আওয়াজ।"

"একে বলে বাইনোরাল বা অডিটরি এন্ট্রেনমেন্ট। আলো আর আওয়াজ মিলে একটা অতি সুসঙ্গত তথ্য প্রবাহ ব্রেনের ভেতর পৌঁছে যায়।  ঠিক যেখানে আগে থেকেই  ক্ষেত্র তৈরী করে রাখা আছে আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে উত্তেজিত করে।"

"মোটামুটি তোমার ব্রেনের মধ্যে একটা প্লাগ লাগিয়ে দেওয়ার মতো।"

"বলতে পারো প্রথমে একটা সকেট লাগানো হলো, তারপর  প্লাগ লাগবে।"

"কিন্তু আসলে তো তার বা নেটওয়ার্ক নেই, তাই না?"

"তার নেই, নেটওয়ার্ক আছে। ওয়াই ফাই বা ৫G  নেটওয়ার্কের মতো। আর সেইটা জোড়া লাগানোর জন্য লাগে নিউরাল একো ম্যাপিং। ব্রেনের মধ্যে যে ক্ষীণ বৈদ্যুতিক বিকিরণ ঘটে, সেগুলোকে ধরে ফেলা হয়।"

"অবিশ্বাস্ব ! ভাবাই যায় না।"

"তবে আরো শোনো। এই বিকিরণগুলো শুধু যন্ত্র নয়, চারপাশের নেটওয়ার্ক, এমনকি ঘরের ওয়াই-ফাই রাউটার, ফ্যানের মোটর, মোবাইলের নয়েজের সঙ্গেও রেজোন্যান্স বা অনুরণন  করে। ফলে সংযোগটা ছড়িয়ে পড়ে অদৃশ্য পরিবেশ জুড়ে।"

"ECG, EEG এর মতো?"

"একদম ঠিক! এর ফলে একটা জীরো ইন্ট্রুশান তথ্য আদানপ্রদানের  পথ তৈরী হয়ে যায়। এতে শরীরে কোন খোঁচা-খুঁচি করতে হয় না।  কিন্তু পথ তৈরী হয়ে গেলেই পুরো সিমুলেশন জগৎ খুলে যায়।"

"আর তার ভেতর দিয়েই আমরা সিমুলেশন গেমের দৃশ্যপট অনুভব করি। মনে হয় আমরা গেমের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছি।" 

"আর সেই প্রথম একবার আলোর ঝিকিমিকি ছাড়া তুমি বুঝতেও পারছোনা যে তোমার মন, তোমার ব্রেন একটা বৃহত্তর কম্পিউটার প্রোগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে।"

"আমি আর আমি নেই? একটা  কম্পিউটার প্রোগ্রামে সৃষ্ট বৃহৎ জগতের ছোট্ট এক অংশ হয়ে  গেছি। যেখানে শরীর আর প্রোগ্রাম একে অপরকে যেন আয়নায় দেখে, সেখানে কে ব্যবহার করছে কাকে, সেটা আর বোঝা যায় না।"

"এসব কি সত্যিই হয়? নাকি তোর তীব্র কল্পনা? অতি তীব্র কল্পনা।"

"দেখো, এই নিউরো ফেজ লিংকেজ সিস্টেমের প্রতিটি অংশ আলাদা আলাদা ভাবে সম্ভব। ট্রান্সক্রেনিয়াল ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন আছে। ফোটোনিক লাইট স্টিমুলেশন করা যায় । বাইনোরাল বা অডিটরি এন্ট্রেনমেন্ট সম্ভব । নিউরাল একো ম্যাপিং সেটাও করা যায়।”

“মানে আলাদা আলাদা ভাবে চার রকম প্রযুক্তিই বাজারে আছে।”

“ঠিক তাই।  কিন্তু সবকটা একসঙ্গে করেছে বলে আমার কাছে কোনো খবর নেই।"

“হয়তো এরাই সেটা প্রথমবার করেছে!”

ডাইকিরি প্রায় শেষ। পারো নিজের গ্লাসের ভেতরে আঙ্গুল ঢুকিয়ে লাল টুকটুকে চেরি ফলটা বের করে মুখে পুরে দিল। ফলটা চুষে খেয়ে দানাটা খালি গেলাসের ভেতর ফেলে দিল। মুখে চিন্তার ছাপ।

"তাহলে এই কর্মটা কে করলো? আর তাও আবার এই কলকাতায় বসে?"

"এতদূর এখনো ভাবিনি? আমি একটা প্রাথমিক খসড়া খাড়া করেছি। যেটা দিয়ে তোমার রাজ বেঙ্গলের ঘটনাটা একটা যুক্তির কাঠামোর মধ্যে বেঁধে ফেলা যেতে।"

"আচ্ছা ক্রয়, একটা জিনিস কিন্তু ফাঁক রয়ে গেল? পারো দি অনেকক্ষন এই সিমুলেশন জগতে ঘুরেছিল কিন্তু আমার ঘড়িতে মোটে দশ  মিনিট দেখাচ্ছে । এটা কি করে সম্ভব?"

"এটার অনেক সহজ উত্তর আছে।" পারো তখন ব্যাপারটা মোটামুটি ধরে ফেলেছে। "আমরা যখন স্বপ্ন দেখি ঠিক এইরকম হয়। ব্রেন ওয়েভ আর রাপিড আই মুভমেন্ট (REM ) থেকে বোঝা যায় যে মানুষ স্বপ্ন দেখে  কয়েক মিনিট, কিন্তু সেই স্বপ্ন তার কাছে মনে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে চলেছে।”

“মানে  স্বপ্নের সময় সংকুচিত হয়ে যায় । এটা খুবই স্বাভাবিক।"

"তাহলে তো মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটাই বোঝা গেল। কেউ এই রকম প্রযুক্তি একত্র করে কালদর্পনের ছদ্মবেশে কলকাতার মেয়েদের এই ত্রিকাল সিমুলেশন জগতে নিয়ে গিয়ে তাদের ছবি তুলছে।"

"কিন্তু কে সেই লোক? আর কি উদ্দেশ্যে সে বা তারা এই কাজ করছে?"

"সেইটাই আসল রহস্য।" পারো একটু থামলো, কি যেন ভাবলো । তারপর প্রায় ফিস ফিস করে, বললো, যেন নিজেকেই বলছে । "যে রহস্যের সুত্র হয়তো আমাদের নিজেদের ভেতরেই লুকিয়ে আছে।"

শিকারির শিকার 

মাসখানেক পরের কথা।

ব্ল্যাক  অর্কিড বারে আজ সাধারণ অতিথিদের প্রবেশ বন্ধ । সেখানে  আজ একটা লেট নাইট স্ট্যান্ড আপ কমেডি শো হবে । রাধিকা আন-প্লাগ্ড । বেশ রগরগে কৌতুকের জন্যে রাধিকা শেঠি এই লাইনে বেশ নাম করেছে । তার শো দেখার জন্য সারা ভারতবর্ষে বেশ ভালোই ভিড় হয় । বিদেশেও হয়। রাধিকার কথা রসাত্মক  আর  দ্বার্থবোধক তো বটেই,  তার ওপরে  খাটো পোশাকেরও  একটা  আকর্ষণ আছে, পুরুষ শ্রোতাদের কাছে। তাঁর শোয়ের টিকিটের দাম অনেক, সহজে পাওয়াও যায় না। অনেক আগে থেকে টিকিট বুক্ড হয়ে  হাউস-ফুল হয়ে যায়। ক্রয় সেই একখানা মহামূল্য টিকিট পেয়েছে।

কালদর্পন টাইমলাইনে বার বার মজার কমেন্ট করার পর ক্রয় অবশেষে আমন্ত্রণ পেয়েছে। তও আবার  এই রাধিকা শেঠির শোয়ের টিকিট সমেত। এখন  না যাওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে। শো এর ঠিক একঘন্টা আগে টিকিট এসেছে, ওর সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিরেক্ট মেসেজের ইন-বক্সে । আগে থেকে হলে হয়তো পারো আর শিখাও যেত কিন্তু ততক্ষনে বুক-মাই-শো তে সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।

--------------------------------------------------

রাজ বেঙ্গল হোটেলে পারোর ওপর কালদর্পন যে সিমুলেশনের খেলা দেখিয়েছিল সেই ব্যাপারটা আরো ভালো করে বোঝার জন্য ওরা এই পথ বেছে নিয়েছে। একটা প্রযুক্তিগত কাঠামোর আবছা ছায়া কিছুটা দেখা গেলেও, ঠিক কি ভাবে খেলাটা হচ্ছে সেটা কারুর কাছেই পরিষ্কার নয়। তার ওপর কে বা কারা  এটা করছে আর কেনই বা করছে সেটা বোঝা খুবই শক্ত।

ক্রয় এই ব্যাপারে বিস্তর গবেষণা করে চলেছে। নানা রকম ওয়েবসাইট ঘেঁটে আর নানা রকম সফ্টওয়ার ডাউনলোড করে তার বেশ কিছুটা জ্ঞান বেড়েছে কিন্তু ব্যাপারটা এতই নতুন আর এতই জটিল যে তার মতন দক্ষ হ্যাকারও খুব একটা এগোতে পারেনি।

"আমাদের আরো কিছু তথ্য দরকার।"

"আর সেটা পাওয়া যাবে এদের সঙ্গে আরো দুএকবার ঠোকাঠুকি করলে।"

কিন্তু একই লোকের দ্বিতীয়বার ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তাই শিখা আর ক্রয়, দুজনেই কালদর্পন টাইমলাইনে ঘোরাঘুরি শুরু করেছে, অবশ্য দুজনেই নিজের পরিচয় লুকিয়ে জালি হ্যান্ডেল তৈরী করে।

বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করার পরে ক্রয়ের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে।

তবে এতদিন  ক্রয় আর শিখা হাত পা গুটিয়ে যে  বসে আছে তা নয় । ক্রয় এই সব নতুন আর  অপরিচিত, প্রযুক্তি নিয়ে ঘাঁটাচাঁটি করছে। এই সব যন্ত্র কি ভারতবর্ষে  পাওয়া যায়? পেলে একটু  নিজে চালিয়ে দেখতে পারতো। শিখার নজর অন্য জায়গায় । তার পক্ষে এসব নতুন জিনিস শেখার চেয়ে আরো জরুরি হল খুঁজে বার করা যে কারা  এদেশে এই সব নিয়ে কাজ করছে। এসব খবর সোজাসুজি পাওয়া সহজ নয়। খুব কম লোকই এইসব নিয়ে কাজ করে আর এই নিয়েই ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে আর ক্রয় কয়েকটা সূত্র পেয়েছে।

প্রথমে ওরা খুঁজে বার করেছে যে এই সব যন্ত্রপাতি কারা কোথায় তৈরী করে । তারপরে খোঁজা হয়েছে তাদের কাস্টমার কারা ? কে এসব যন্ত্রপাতি কিনছে। এই তথ্য সহজে পাওয়া যায়না। সব কোম্পানিই তাদের ক্রেতাদের  আড়ালে রাখে, কিন্তু ক্রয় এই সব কোম্পানির একাউন্টস সিস্টেম হ্যাক করে বেশ কিছু নাম বার করেছে। আসল সিস্টেম হ্যাক না করতে পারলেও এদের ডেলিভারি কোম্পানির কম্পিউটার সিস্টেম থেকে বার করেছে যে এরা  কাদের কাছে মাল পাঠাচ্ছে। এইরকম করে খুঁজতে খুঁজতে বেশ কিছু সন্দেহজনক নাম জোগাড় হয়েছে।

ইসরায়েলের হাইফা শহরে ইনসাইটেক বলে একটা কোম্পানি আছে যারা এই ট্রান্সক্রেনিয়াল ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্র তৈরী করে। একই ধরনের যন্ত্র তৈরী করে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্মাই টেকনোলজিস । খুব বেশি না হলেও, প্রায় হাজার দু এক  কাস্টমারের নাম নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে দুটো কাস্টমারের নাম পারোর  চোখে লেগেছে । একটার নাম হলিস্টিক  ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার। আর একটা হলো হলোগ্রাফিক  ইমেজিং এন্ড নিউরাল ডিকোডিং সার্ভিসেস ।

কম্পিউটার সার্চে যা কখনোই ধরা পড়বে না, সেটা পারোর ফরেনসিক একাউন্টেন্টের নজরে ঠেকেছে । চোখ দাঁড়িয়ে গেছে ।

"হলিস্টিক  ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার  - মানে এইচ-আই-এন-ডি । হিন্দ।"

"তার মানে?"

"আবার হলোগ্রাফিক ইমেজিং এন্ড নিউরাল ডিকোডিং। আবার সেই এইচ-আই-এন-ডি। হিন্দ। দুটোই  হিন্দ । এটা কি কাকতালীয়?"

"তুমি কি একটু জোর করে অঙ্ক মেলাবার চেষ্টা করছো  না?"

"আমি হয়তো মেলাচ্ছি, কিন্তু তার থেকে বড় কথা হলো আমার মনে হচ্ছে আর কেউ জোর করে এই নামের অঙ্কটা মিলিয়েছে।"

"মানে?"

"দুটোই কৃত্রিম নাম। আসল নামটাকে  ঢাকার জন্যে, আড়াল করার জন্যে, এই নামে  অর্ডার দিয়েছে। কিন্তু একটু দুষ্টুমি করে নিজের নাম বা নিজের পরিচয়ের একটা ছোঁয়া রেখে দিয়েছে ।"

"এইচ আই এন ডি - হিন্দ ? ইন্ডিয়া? ভারতবর্ষ? কোনো ভারতীয় কোম্পানি?"

"অদ্ভুত  -- দুবার  হিন্দ। যেন ভারতবর্ষের সঙ্গে কোথাও একটা যোগাযোগ আছে।"

"এটা পারোদির বিশুদ্ধ কল্পনা প্রসূত। পিওর স্পেকুলেশন।"

"দেখ শিখা, নেই মামার থেকে কানা মামা তো ভালো! আপাতত আমাদের হাতে কিচ্ছু নেই। কোথাও থেকে তো শুরু করতে হবে।"

"আচ্ছা ক্রয় তুই তো এতো কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করিস মেশিন নিয়ে, তুই এরকম কিছু একটা তৈরী করতে পারিস না।"

"কি যে বলিস শিখা এই সব প্রযুক্তি বানাতে প্রচুর টাকা লাগে। কোটি কোটি ডলার। সি-আই-এ সে সব ফান্ডিং করে। আর সেখানে আমাদের জেমিনি কনসাল্টিং এর ক্রয়। এটা তোর আশা করাই ভুল।"

"না । ওয়েন রিসোর্সেস আর লিমিটেড, ক্রিয়েটিভিটি ইস আনলিমিটেড। ভারতবর্ষ মানে  জুগাড় ।  ফ্রুগাল  প্রযুক্তি।"

"তার মানে তুই একটা কিছু করে ফেলেছিস! "

"আমি হাত গুটিয়ে বসে নেই ম্যাডাম। অলিমেক্স বলে একটা বুলগেরিয়ান কোম্পানি আছে,  যারা একটা ওপেন সোর্স ই-ই-জি হার্ডওয়্যার তৈরী করে।”

“এটা কি আমরা কিনতে পারি? কত দাম?”

“ওদের একটা নিউরোফিডব্যাক সেন্সর পাওয়া যায় মাত্র ৯৯ ইউরো তে। সেটা আমি জেমিনির পার্চেস ডিপার্টমেন্ট কে কিনে আনতে  বলেছি। আশা করছি দু এক দিনের মধ্যে এসে যাবে।"

“এসব তুই বুঝিস?” পারো অবাক।

ক্রয় যে কত কী জানে, কত কী করতে পারে, সেটা পারো খুব ভালো করেই জানে। তবু প্রতিবারের মতো এবারও ক্রয়ের বুদ্ধিমত্তা দেখে পারোর মন ভরে গেল, বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে উঠলো। নিজেকে সামলাতে না পেরে সে তার প্রাণের মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে এক চুমু দিয়ে দিল। শিখা সব জানে, তাও, তার সামনে, এই হঠাৎ চুমুতে ক্রয় খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। একটু বোকা বোকা হেসে আবার বোঝাতে শুরু করলো সে।

"ওপেন বি সি আই নামের একটা অনলাইন কমিউনিটিতে অনেকেই ওই অলিমেক্স সেন্সর দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছে। আমি তাদের কোডটাও ঘেঁটে দেখেছি।"

"তাই দিয়ে কি হবে? তুই থট কন্ট্রোল করবি?"

"অরে না না, এত সোজা নয়। এই দিয়ে আমি কোনো ইনভেসিভ মেসেজ এলে সেটা ধরতে পারবো। বুঝবো কেউ চেষ্টা করছে ।"

"থামাতে পারবে?"

"থামানোটা সহজ। চোখে পোলারাইসিং সানগ্লাস পরলে আর কানে সাউন্ড ক্যানসেলিং ইয়ারফোন লাগালে বাহিরের সব আলো আর আওয়াজ বন্ধ হয়ে যাবে।"

"আর এই ট্রান্সক্রেনিয়াল উল্ট্রাসোনো?"

"সেটাকে কাটানোর জন্য মাথায় একটা জালের টুপি পরা যায়। জালের মধ্যে আমি একটা মৃদু স্টোকাস্টিক ফিল্ড চালাবো, যেটা কোনো ইনকামিং সিগন্যালকে র‍্যান্ডম ডিফেজ করে দেবে।"

"ডিফিউজ করে দেবে? থামিয়ে দেবে?"

"ডিফিউজ নয় ডিফেজ। সিগন্যালের কোহেরেন্স নষ্ট করে দেবে। সুসংগত আওয়াজের ছন্দপতন হবে।"

"এটা তুই তৈরী করতে পারবি?"

"লেগে আছি। একটা ট্রান্সমিটার তৈরী হয়েছে কিন্তু সেটা বেজায় বড়, ঢাউস। তবে তার  সিগন্যাল যদি আমার ওই বুলগেরিয়ান যন্ত্রটি ধরতে পারে তাহলে আমার পকেটে রাখা ব্যাটারি থেকে টুপিতে সিগন্যাল পাঠিয়ে বাইরের সিগন্যাল থামিয়ে দিতে পারবো।"

"মানে আমাকে যেমন কব্জা করে ফেলেছিল, সেরকম কেউ করতে পারবে না।"

"সেটাই আশা করছি, যদি না এরা আরো নতুন কোনো অস্ত্র বা প্রযুক্তি নিয়ে  আসে। তবে সেটার সম্ভাবনা কম। ওরা তো আর জানেনা যে আমরা তৈরী হয়েছি!"

"তাহলে ক্রয়  বা আমি,  যেই এই যুদ্ধে যাই না কেন, আমাদের কাছে তরোয়াল না থাকতে পারে, কিন্তু ঢাল ঠিকই  থাকবে।"

--------------------------------------------------

লেট নাইটের ভিড় ঠেলে ব্ল্যাক  অর্কিড  ঢুকতেই ক্রয় বুঝতে পারলো আজকের শিকারটা সহজ হবে না…

যে ঘরে শো টা হবে সেটা গোল আর চৌকোর মাঝামাঝি একটা ডিম্বাকার আকৃতির। ছোট ঘর, প্রায় শ খানেক  মানুষ ধরবে, চাপাচাপি করে । তাদের বসার জন্য ঘরের মাঝেও টেবিল আবার দেওয়ালের ধারেও টেবিল। ঘরের এক মাথায় স্টেজ, স্পটলাইট -- সেইখানেই রাধিকা অনুষ্ঠান পরিবেশন করবেন। উল্টো দিকে, ঘরের অপর কোনে, বার । আজকের অনুষ্ঠানের স্পনসর হীরা৯১ বিয়ার কোম্পানি । তাদের কৃপায় আজ বিনাপয়সায় অফুরন্ত বিয়ার। অন্য কিছু খেতে হলে (বাঙালিরা জল, বিয়ার সব কিছুই খায়!) নিজের পয়সা লাগবে।

শো শুরু হল। চলছে ! ডার্টি জোকস এর বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু লোক তাইতে খুব হাসছে, হাততালি দিচ্ছে। এই সব স্ট্যান্ড আপ কমেডি, যাকে কিছু লোক আবার হাস্য কবি সম্মেলন বলে থাকে, এখানে হাসি না পেলেও হাসতে হয়! ক্রয়ের বেশ বিরক্তি লাগছে। কিন্তু হীরা৯১ বিয়ারটা খুবই ভালো। ক্রয় বেশ কয়েক বোতল নাবিয়ে দিয়েছে। তাই এবার টয়লেট যাবার পালা।

--------------------------------------------------

এদিকে ব্ল্যাক অর্কিডের বাইরে, অন্ধকার রাস্তায় একটা পুলিশের গাড়িতে পারো আর শিখা বসে আছে, সঙ্গে লোকাল থানার একজন  কনস্টেবল । টিকিট কেটে ঢুকতে না পারলেও তারা ক্রয়কে একা ঠেলে দেয়নি।

"ক্রয় ব্যাটা রাধিকার নাচ দেখছে আর আমরা এইখানে বসে মশার কামড় খাচ্ছি। কি কপাল করেছি।"

"বিয়ারও প্যাঁদাছে। ফ্রি বিয়ার।" কিছুক্ষন আগে ক্রয় হলের ভেতর থেকে মেসেজ পাঠিয়ে তার স্টেটাস জানিয়েছে । এটাও ঠিক আছে যে যদি ওর জালের টুপিতে ট্রান্সক্রেনিয়াল স্টিমুলেশনের আভাস পাওয়া যায়, তাহলে  সেই খবরটা পারোর কাছেও চলে আসবে।

"যাই বলো না কেন, আমার লাভার বয় বেশ অসাধারণ একটা ফাঁদ পেতেছে। যদি সত্যিই আল্ট্রা সোনো সিগন্যাল দিয়ে ওকে কব্জা করার চেষ্টা হয়, তাহলে আমরা সেটা শুধু যে জানতে পারবোই তা নয়, ওর জ্যামার দিয়ে সেই সিগন্যাল চাপা দিয়ে দেবে।"

"কিন্তু কে করছে সেটা কি করে ধরা যায়?"

"অপেক্ষা করা যাক, কি হয় দেখে আমাদের পরের পদক্ষেপ নিতে হবে ।"

বেশিক্ষন আর অপেক্ষা করতে হল না। হটাৎ পারোর পাশে রাখা একটা ফোনে এলার্ম বেজে উঠলো। পারো, শিখা আর সাথে পুলিশের লোকটি তিনজনে গাড়ি থেকে নেমে ছুটলো ব্ল্যাক অর্কিডের দিকে। মিনিট তিন চারের মধ্যেই ওরা  অর্কিড মলের গেটে পৌঁছে গেল। রেস্টুরেন্টটা মলের বেসমেন্টে। মলের প্রবেশ দ্বারে সিকিউরিটি চেকপয়েন্ট। সেখানে এত রাতেও বেশ কিছু লোকের জটলা। গার্ড লোককে সার্চ করছে কিন্তু ওদের সঙ্গে পুলিশ দেখে ওদের ছেড়ে দিল। তাও  একটু দেরি হয়ে  গেল । আগে থেকে জায়গাটা ওদের দেখে রাখা ছিল, তাই এস্কেলেটর দিয়ে বেসমেন্টে নেমে  রেস্টুরেন্ট খুঁজে পেতে বেশি দেরি হলো না । তারপরে রেস্টুরেন্টের দ্বাররক্ষী। তাকে প্রায় ঠেলে সরিয়ে তিনজনে ঢুকে পড়লো।

কিন্তু এবার কোথায়? ভেতরে রাধিকার অনুষ্ঠান  চলছে। লোকে শুনছে, হাততালি দিচ্ছে ।

"টয়লেটে চল।" পারোর মনে আছে রাজ বেঙ্গলের কথা।

"ওই তো ঐদিকে টয়লেট।" একটা লম্বা করিডোরের একেবারে শেষে টয়লেট। ওরা সেই দিকে এগিয়ে গেল । তাড়াহুড়ো তে কেউই খেয়াল করলো না যে ওদের পাশ দিয়ে উল্টো দিকে বেরিয়ে গেল একজন নেপালি গুর্খা জাতীয় লোক। একটু তাড়াতাড়ি করে।

"জেন্টস টয়লেটে চল।"  দুই মহিলা আর এক পুলিশ ছেলেদের টয়লেটে ঢুকে পড়লো। আর ঢুকেই দেখে ক্রয় মাটিতে পড়ে আছে!

--------------------------------------------------

পরের দিন সকাল ।

রাতটা একটা নার্সিং হোমে  কাটিয়ে পারো আর শিখা  যখন ক্রয়কে নিয়ে পারোর বাড়িতে পৌঁছলো তখন প্রায় দুপুর বারোটা বাজে। লাঞ্চের জন্য পিৎজা অর্ডার করে ওরা তিনজনে বসেছে কালকের ঘটনা বিশ্লেষণ করতে। ক্রয়ের খুব একটা ছোট লাগেনি। তাও ঘাড়ের ওপর একটা আইস প্যাক দেওয়া রয়েছে।

"তোকে কে মারলো তুই বুঝতে পারলি না?"

"একটা নেপালি  গোছের ষণ্ডা মার্কা ছেলে।"

"কেন?"

"কারণ আমি ওদের যন্ত্রটা টেনে বের করেছিলাম।"

"মানে?"

"দেখো, বিয়ার খেয়ে প্রচণ্ড হিসি পেয়ে গেছিল। টয়লেটে গিয়ে যেই কাজ শেষ করেছি এমনি আমার এলার্মটা বেজে উঠলো। আমার হোম-মেড  জ্যামারটা আমার পকেটে ছিল। অন করে দিলাম।"

"এক হাতেই পারলি?" শিখা ফিক করে হেঁসে ফেললো। "সিনটা কল্পনা করছি।"

"এই তুই চুপ করবি। ওকে বলতে দে।"

"আমি জ্যামারটা ফুল ফোর্সে অন করেই  বুঝলাম কাজ হয়েছে ।" ক্রয় বলে চললো। "ইউরিনালের উল্টো দিকে, বেসিনের ঠিক তলায় একটা কড়কড় আওয়াজ। যেন স্পার্ক বেরোচ্ছে। আমার জ্যামার ওদের মেশিনে কিছু গন্ডগোল করে দিয়েছে। আমি তখন কোন রকমে প্যান্টের জিপ টানতে টানতে ছুটে  গিয়ে সেটাকে দেখার চেষ্টা করি।"

"তারপর?"

"জিনিসটা কায়দা করে রাখা ছিল। আমি টেনে বার করতেই ওর সঙ্গে লাগানো ইলেকট্রিক তারটা ওর গা থেকে খুলে গেল। একটা জুতোর বাক্সের মতো। গায়ে বেশ কিছু এল-ই-ডি আলো । জ্বলছিল, নিভে গেল। আমি সেটাকে দেখছি এমন সময় আমার পেছনে কোনো লোকের পায়ের জুতোর আওয়াজ পেলাম ।"

"সে কে?"

"একটা গুর্খা ছেলে । বেশ ওয়েল বিল্ট। জিন্স, টি-শার্ট। এক ঝলক দেখেছি।"

"এইরকম একটা লোক আমাদের পাশ দিয়ে গেছিলো না? যখন আমরা টয়লেটের দিকে যাচ্ছি?"

"তা জানিনা, তবে সে আমার কাছ থেকে ওই বাক্সটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। আমিও লড়ে  গেলাম। তবে লোকটা  কায়দা জানে।"

"নিশ্চয় জুডো কারাটে এক্সপার্ট।"

"হতেই পারে । আমি আর বেশি কিছু বোঝার আগেই সে আমার হাত ধরে ঘুরিয়ে দিল। তার পরেই   ঘাড়ে একটা সাংঘাতিক আঘাত ! চোখ অন্ধকার হয়ে  গেল। আর মনে নেই। "

"আর একটু হলেই আমরা ওখানে পৌঁছে যেতাম। একটুর জন্যে মিস হয়ে গেল।"

"তা জানিনা, কিন্তু তারপর আমার যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি  নার্সিং হোমের খাটে। সামনে দুই সুন্দরী মহিলা।" ক্রয় হাসছে।

"তুই হাসছিস? কত বড় বিপদ হতে পারতো।" পারোর গলায় উদ্বেগ। চোখে সামান্য জল।

"এই জন্যই বলি মার্শাল আর্ট শেখ।"

"তুই চুপ কর। হঠাৎ হলে কিছুই করা যায়না।"

"বাক্সটা হাতে পেলে ব্যাপারটা বোঝা যেত। সে আর হলো না ।" ক্রয়ের গলায় একটা হতাশার সুর।

"সেইটাকে তোর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য লোকটা  তোকে আক্রমণ করেছিল।"

"যেই বুঝেছে যে আমরা ওটাকে খারাপ করে দিয়েছি, ওই লোকটা ছুটে এসেছিল  ওটাকে বাঁচাবার জন্যে।"

"লোকটাকে পেলে কাজের কাজ হতো।"

"লোকটাকে আমরাও দেখেছি, তখন খেয়াল করিনি। আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। তখনই যদি একটু খোঁজ করা যেত, কিছু কিনারা হতে পারতো।"

"তখন তো আমরা ক্রয়কে নিয়েই ব্যস্ত।"

"আবার খুঁজে বার করবো। ইউ ক্যান রান বাট ইউ কাননট হাইড। পায়ের ছাপ খুঁজতে হবে । ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টস।"

--------------------------------------------------

সপ্তাহ খানেক পরের কথা। রবিবার সকালে পারোর বাড়িতে তিন মূর্তি জমায়েত হয়েছে।

"হেক্স ইনফো নেটওয়ার্কস এন্ড ডাটা সিস্টেমস । এইচ-আই-এন-ডি । হিন্দ।"

"আবার সেই হিন্দ? এটা আবার কোথায় পেলে?"

পারো বসে থাকার পাত্রী নয়। 

"তোকে যে টিকিটটা পাঠিয়ে ছিল, সেটা বুক-মাই-শো থেকে অনলাইন কেনা হয়েছিল। ক্রেডিট কার্ডে কেনা। অনেক টিকিট বিক্রি হয়েছে। কোনটা তোর টিকিট জানিনা । সব কার্ড আর ইউ-পি-আই থেকে ব্যাংকের একাউন্টের ডিটেইলস এনেছি। বেশি নয় একশোর মত নাম। তার মধ্যে জ্বলজ্বল করছেএই নাম। হিন্দ।"

"দুর্দান্ত !"

"এই কোম্পানির নাম দিয়ে সার্চ করলাম। নির্ভানা ল্যাবস। হেক্সের একটা একটা সাবসিডিয়ারি সহযোগী কোম্পানি ।"

"নির্ভানা ? নির ভান ? নির বান। নির বন । বন নির । মনে পড়ে ।"

"যেখানে তোমায় নিয়ে গিয়ে  .. "

"একদম ঠিক। দুটো টিক পড়েছে। হিন্দ আর বন নির ।"

"কিন্তু এইটাই  কি যথেষ্ট প্রমাণ ?"

"একবার গিয়ে সরোজমিনে তদন্ত করতে হবে।"

--------------------------------------------------

সল্ট লেকের সেক্টর ৫ এ বিরাট বহুতল অফিস বিল্ডিঙের ষোল তলায় "নির্ভানা লাবরেটরিস " এর কার্যালয়। নেমপ্লেটের ওপর ছোট ছোট করে লেখা  - এ সাবসিডিয়ারি অফ হেক্স ইনফরমেশন নেটওয়ার্কস এন্ড ডাটাসিস্টেম্স । পরের দিনই, সোমবার সকাল সকাল সেখানে  পারো আর শিখা সেখানে পৌঁছে গেছে।

রিসেপশনিস্ট বললো যে ওদের কর্ণধার একটু ব্যস্ত আছেন । অপেক্ষা করতে হবে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল না। ঘন্টা খানেক পর ওদের ডাক পড়লো।

"নমস্কার।" লম্বা চওড়া মানুষ। ভদ্র ব্যবহার। "আমার নাম যতীন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল যতীন সরকার, রিটায়ার্ড। আপনারা বলেছেন যে পুলিশ থেকে আপনাদের পাঠিয়েছে। কি ব্যাপার?"

"আমরা কেউই পুলিশে কাজ করিনা কিন্তু আমরা পুলিশের দরকারই এখানে এসেছি। এই হলো একটা চিঠি, কমিশনারের তরফ থেকে।" পারো একটা কাগজ এগিয়ে দিল। যতীন বাবু সেটা পড়লেন। পড়ে ফেরত দিলেন।

"ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেল কালদর্পণ ?" কর্নেলের মুখে প্রশ্ন ।

"এটার সম্বন্ধে আপনি কিছু জানেন?"

"না? আমার কি কিছু জানা উচিত?"

"সেটা তো আর আমি বলতে পারবো না। যাইহোক,  আচ্ছা বলতে পারেন আপনাদের এই ল্যাবে কি ধরনের কাজ হয়?"

"আমরা সফ্টওয়ার কোম্পানি, দেশ বিদেশের ক্লায়েন্টদের জন্যে সফ্টওয়ার লিখি, মেনটেন করি। আমাদের মতো আরো অনেক এরকম কোম্পানি আছে।"

"আমরা কি আপনাদের নির্ভানা ল্যাবস টা একটু ঘুরে দেখতে পারি?"

"না। সেটা সম্ভব নয়। ক্লায়েন্ট কনফিডেন্সিয়ালিটির নিয়ম আছে।" সেটা অবশ্য আশ্চর্য কিছুই নয়। পারো জানে এরকম হয়েই থাকে।

"আচ্ছা আপনারা কি ধরনের কাজ করেন এখানে?"

"যেমন সব জায়গায় হয়। ব্যাঙ্কিং ক্লায়েন্ট আছে, মেডিক্যাল ক্লায়েন্ট আছে।"

"আচ্ছা কর্নেল সরকার, মেডিক্যাল ক্লায়েন্ট বলে বলছি, আপনারা কি ট্রান্সক্রেনিয়াল আলট্রা সোনো স্টিমুলেশন  এর ওপর কাজ করেন?"

"কি বলছেন? এসব আমরা বুঝি না। সোজা হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়েই আমাদের কাজ।"

"আচ্ছা কর্নেল আপনার পেছনে টেবিলে রাখা ওটা কিসের ছবি।" একটা ছাগলের ছবি দেখিয়ে পারো জিজ্ঞেস করলো।

“ওটা আমার পুরোনো রেজিমেন্টের ব্যাজ। লাদাখ স্কাউটসের আইবেক্স।”

"আচ্ছা ইসরায়েলের ইনসাইটেক থেকে কি আপনারা কখনো কোনো ইকুইপমেন্ট কিনেছেন?"

কর্নেল কিছুক্ষন চুপ করে কিছু ভাবলেন। "না। সেরকম তো কিছু মনে পড়ে না।" কর্ণেলের গলার স্বর বেশ ক্ষীণ।

"সান্মাই টেকনোলজিস ? একটু ভাবুন।"

"কি সব নাম বলছেন, কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার কাজ আছে একটু যেতে হবে।" এবার গলার স্বর একটু রুক্ষ হয়ে গেল।

"আচ্ছা হলিস্টিক  ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার   অথবা হলোগ্রাফিক ইমেজিং এন্ড নিউরাল ডিকোডিং বলে কোনো কোম্পানির সঙ্গে আপনাদের কোনো যোগাযোগ আছে?"

"এই সব উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে আপনি আমার আর সময় নষ্ট করবেন না প্লিস।" বেশ বিরক্তির ভাব।

"এই দুটো কোম্পানি আর আপনাদের কোম্পানির তিনটের মধ্যে একটা মিল আছে। একই আদ্যাক্ষর। এইচ-আই-এন-ডি । হিন্দ। বেশ কাকতালীয় তাই না?"

"দেখুন, আমার আর সময় নেই। আপনাদের আর কিছু জানার থাকলে কমিশনারকে  বলবেন আমার সঙ্গে সোজাসুজি যোগাযোগ করতে।"

"একটু দু এক জনের সঙ্গে  .. "

"সরি, না।" কর্নেল একটা বেল টিপলেন। একটা গুর্খা লোক এসে ঘরে ঢুকলো। "তাশি, আমার এই গেস্ট দের একটু রাস্তা অবধি পৌঁছে দিয়ে এস তো।" সহজ ভাষায় গলা থাক্কা ।

"জি হুজুর ।" একেবারে আর্মির লোক, বোঝাই গেল। "আসুন ম্যাডাম।" 

বুঝিয়ে দিল যে পারো আর শিখার বেরিয়ে না  যাওয়া ছাড়া  আর কোনো উপায় নেই।

--------------------------------------------------

"এই তাশিই সেদিন ব্ল্যাক অর্কিড ছিল। ওকেই দেখেছিলাম টয়লেট থেকে বেরিয়ে যেতে।"

"আর ওর টি-শার্টটা দেখলি? বুকে একটা লাসা র পোটালা প্যালেসের ছবি। বন নীড়ে  ওই আমাকে আরাম দিয়েছিল।" পারো হাসলো। "যদিও সেটা পুরোই আমার কল্পনা বা স্বপ্নের মধ্যে।"

“তাই?”

“আর ওই ছাগলটা দেখলি! ওটাও দেখেছিলাম মাটির তলায়। একটা দোকানে।

"তাহলে তো  এবার তো পুলিশ কমিশনারকে বলতে হবে এদের আইনত জিজ্ঞাসাবাদ করতে। আমরা তো আর এর থেকে বেশি খোঁজ খবর করতে পারবো না ।"

"সে তো ঠিক। আজ বাড়ি গিয়ে ফোন করবো । তার আগে একটা কুইক লাঞ্চ? কোথায় খাবি?"

--------------------------------------------------

কিন্তু বাড়ি ফিরে আর ফোন করা হল না। তার আগেই কমিশনারের অফিস থেকে পারোর কাছে একটা ফোন এলো। কালদর্পণ নিয়ে সব অনুসন্ধান এক্ষুনি বন্ধ করতে হবে।

"কিন্তু কেন স্যার? আমরা কিন্তু প্রায় অপরাধীর দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি। রহস্য ভেদ করে ঢুকতে আপনার সাহায্য দরকার।"

"সরি পারো। আমি পারবো না তোমাকে কোন সাহায্য করতে ।  আমার ওপর আদেশ আছে যে তোমাকেও যেন বলা হয় এর থেকে সরে আসতে।"

"আর যিনি আমাদের এই কাজে নামতে অনুরোধ করেছিলেন? সেই আমলা?”

"সে তো চুনো পুঁটি। তার চেয়ে অনেক উঁচু জায়গা থেকে এই হুকুম এসেছে। নামটা বলছি না, শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে।"

"দিল্লি? পি-এম-ও ?"

"আর কথাটা বাড়িও না। প্লিস।" লাইন কেটে গেল।

পারো আর কথা বাড়ায়ে নি কিন্তু বাড়ি গিয়ে সে কর্নেলের পিছনে যে ছাগলের ছবিটা দেখছিল সেটা নিয়ে গুগুল সার্চে খোঁজ করতেই আসল লাদাখ স্কাউটের রেজিমেন্টাল ইন্সিগ্নিয়া পেয়ে গেল। আর তার পর থেকেই পারোর মেলবক্স আর টাইমলাইন ভোরে গেল তিব্বত বেড়াতে যাবার বিজ্ঞাপনে!

তার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল তিব্বতের  শিগতসে তাশি লুনপো মনাস্টারির থাংকা উৎসব যেখানে বুদ্ধের খুব বড় বড় থাংকা প্রদর্শন করা হয়। আর শিগতসে হল কৈলাশ মানাস সরোবর যাওয়ার পথে একটা বড় শহর ।

 কালের জাতক  

পারো ভেবেছিল যে লোবসাং চলে যাবার পর ও ভালো করে শিখাকে জিজ্ঞেস করবে যে মন্দিরে গিয়ে কি দেখেছে ? আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন, কি করেছে? কিন্তু হোটেলে পৌঁছেই পারোর যেন আবার জ্বর জ্বর ভাব। সারাদিন শরীরটা যেমন তরতাজা ছিল সেটা আর নেই। গাটা  ম্যাজ ম্যাজ করছে । মাথা ঝিম ঝিম করছে। দেহের ক্লান্তিটা যেন ও এখানে রেখে চলে গেছিল, ফিরে এসে আবার তুলে নিল। আজ আর কথা না বাড়িয়ে তারা দুজনেই চুপচাপ শুয়ে পড়লো।

দলের বাকি সদস্যরা, যারা কৈলাশ পরিক্রমা করতে গেছে, তারা আগামীকাল সকালে ফিরবে। তার পরেই আবার বাসে করে শিগতসের পথে রওনা দিতে হবে। তারপর লাসা, কাঠমান্ডু হয়ে কলকাতা!

“শিখা ওঠ। আলো ফুটছে।” হোটেলের জানলা দিয়ে পারো নীল আকাশ দেখতে পাচ্ছে। নীল আকাশের গায়ে বরফে ঢাকা পাহাড়, যদিও এখন থেকে সোজাসুজি কৈলাশ পর্বত দেখা যায় না। “একটু পরেই সকলে এসে যাবে।”

“তোমার শরীর কেমন?”

“একটু ভালো। তবে এখনো পুরো ফিট মনে হচ্ছে না । আর একদিন রেস্ট নিলে বোধয় ভালোই হতো।”

“কিন্তু সে তো সম্ভব নয় । আজই তো বেরুতে হবে।”

“চল । ব্রেকফাস্ট খেয়ে ঠিক হয়ে যাবে।”

মুখ হাত ধুয়ে ওরা হোটেলের রিসেপশনে নেমে এসে দেখলো যে হোটেল সুনসান। কেউ কোথাও নেই। রিসেপশন ডেস্ক ফাঁকা। ম্যানেজারের অফিসে তালা ঝুলছে। ডাইনিং হলে গিয়ে ডাকাডাকি করতে অবশেষে একজনকে পাওয়া গেল।

“ভাই ব্রেকফাস্ট কখন পাওয়া যাবে?”

“আজ তো একটু দেরি হবে। কুক বাড়ি গেছে, আসতে প্রায় দুপুর হয়ে যাবে।”

“কিন্তু আমাদের তো আজ এখন থেকে বেরিয়ে যাবার কথা? আমাদের দলের বাকি সদস্যরা তো এখুনি ফিরে আসবে।”

“না না এ আপনারা কি বলছেন? ওর এত তাড়াতাড়ি ফিরবে কি করে?”

“তার মানে?” পারোর বুকটা কেন জানি কেঁপে উঠলো।

“ওরা তো সবে গতকাল কৈলাশ পরিক্রমা শুরু করলেন! আগামীকাল ফিরবেন।”

“সে কি? ওরা তো গতপরশু, মানে গতকালের আগের দিন বেরিয়েছেন । আমরা তো গতকাল  ….” পারো নিজের কথাটা শেষ করতে পারলো না। মনে পড়ে যাচ্ছে রাজ বেঙ্গলের কথা। তাহলে কি আবার সেই ঘটনা?

“না ম্যাডাম। আপনাদের ভীষণ ভুল হচ্ছে। ওরা  গতকাল গেছেন, আগামীকাল ফিরবেন। আজ আপনার বিশ্রাম করার দিন।”

“কিন্তু লোবসাং যে  ..”

“ও বেটা পাগল । কি যে করে? কখন আসে ? কখন যায় ? ওর কথা ছেড়ে দিন।”

--------------------------------------------------

“এইবার রহস্য টা পরিষ্কার হচ্ছে পারো দি।” ক্রয় গলায় বেশ উত্তেজনার সুর ।

কলকাতায় ফিরে এসে ওরা তিনজন বসে ঘটনার পোস্ট-মর্টেম কাটাছেঁড়া করছিল। ভালো কথায় অপারেশানাল ডি-ব্রিফ। পারো আর শিখা না থাকায়, অফিসের একটা জরুরি কাজে কিছুদিনের জন্যে ক্রয় কে একটু দিল্লি যেতে হয়েছিল। আজই দুপুরে ফিরেছে।

“কি পরিষ্কার হলো?”

“রাজ বেঙ্গল হোটেল আর দারচেন। দু জায়গাতেই তুমি বা তোমরা  যেন একটা সময়ের ভাঁজে অথবা কালের ফাটলের ভেতরে পড়ে গেছিলে।”

“অথবা জোর করে ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”

“কিন্তু কেন?”

“এটা নিশ্চয়  ভারতীয় সেনাবাহিনী আর তিব্বতি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কোনো একটা যৌথ প্রচেষ্টা।”

“থট কন্ট্রোল? মেন্টাল ইলিউশন?” পারো ভেবে চলেছে।  “এরা নিশ্চয় কিছু একটা সাইবার অস্ত্র তৈরী করছে। কলকাতায় পরীক্ষা করছিল।”

“শিঙ ওয়ালা ছাগলটা হলো লাদাখ স্কাউট রেজিমেন্টের চিহ্ন। আর সেইটা তুমি ধরে ফেলতেই ওরা জোর করে আমাদের অনুসন্ধান বন্ধ করে দিল।”

“কিন্তু আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছিনা ক্রয়। এই সবের পর ওরা আমায় আবার ওখানে কেন ডেকে নিয়ে গেল?”

“এটা সত্যিই একটা বড় রহস্য।”

“কিন্তু এর থেকে আরো বড় একটা রহস্য আছে পারো দি।” পাশ থেকে খুব শান্ত গলায় শিখা বললো ।

“আবার কি রহস্য রে?”

“দারচেনে পুরো একটা দিন যদি একটা ইলিউশন হয় তাহলে তো আমার সঙ্গে লোবসাং এর শারীরিক ভাবে দেখা হওয়া অসম্ভব।”

“তাতো বটেই! সবটাই মনের ভুল।সে তো ক্রয় কবে থেকে বলে আসছে।”

“কিন্তু তা হলে বার আমায় তোমরা বোঝাও যে  আমার গর্ভে এই বাচ্চাটা কে দিয়ে গেল?”

“কি বলছিস তুই, শিখা ? তোর পেটে বাচ্চা?”

“হ্যাঁ ক্রয়, সেই কাঠমান্ডুতে আমার পিরিয়ডস  হয়েছিল। তার পরের পিরিয়ড আমার মিস হয়েছে।” শিখার  মুখে সে এক মিষ্টি  হাঁসি। “আজকেই চেক করেছি, আমি প্রেগন্যান্ট!


Comments