স্বকণ্ঠে পাশঃ

শিখা আর পারো - পারোলিকা মুখার্জি - দুজনেই জেমিনি কনসাল্টিং কোম্পানিতে কাজ করে। পারো ফরেনসিক একাউন্টেন্ট, কিন্তু সব ব্যাপারেই তার ডাক। চল্লিশ পেরিয়ে গেছে, শরীরে একটু মেদ জমেছে কিন্তু লম্বা চেহারা বলে বোঝা যায়না। শিখা মান্ডি বয়েসে ছোট। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু কলেজে এন সি সি করে আর কারাটে মার্শাল আর্টস শিখে তার দুর্ধর্ষ বডি। সে পারোর সঙ্গে ফিল্ড ওয়ার্ক করে। ওদের 'ত্রুটি'তে, তৃতীয় আর একজন আছে, কল্যাণ রায়, ক্রয়, যে তুখোড় কম্পিউটার হ্যাকার, কিন্তু তার বেজায় ল্যাদ, বাড়ি থেকেই কাজ করে। বেরোতে চায় না।

আজকালকার দিনের অল্প বয়সী  ছেলেমেয়েদের মত পারো বেশি বেলা অবধি ঘুমোতে পারে না। তাই ছটা বাজতে না বাজতেই সে খাট ছেড়ে উঠে কফি-মেকারটা চালিয়ে দিয়ে বাথরুমে চলে গেল। বর্ষাকাল, সারারাত ঝির ঝির করে বৃষ্টি হয়েছে, একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। রাতে পরে থাকা ছোট্ট লঞ্জারের ওপর একটা স্টোল জড়িয়ে, কফির মগটা হাতে নিয়ে শোবার ঘরে একটা উঁকি দিয়ে দেখল যে ক্রয় এখনো পাশ বালিশ জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। গতকাল, শুক্রবারের তাড়নায় অনেক রাত হয়ে গেছিলো, তাই ক্রয় রাতে থেকে গেছিলো। আজ শনিবার, উইকএন্ডের জের এখনো কাটতে অনেক দেরি, ডাকা বৃথা। বারান্দার বিরাট কাঁচের দরজার ভেতর দিয়ে বাইরের মেঘলা আকাশে সামান্য রোদের ছোঁয়া দেখা যাচ্ছে। দিন শুরু হতে এখনো ঘন্টা দেড়েক বাকি। জুলাই মাস হয়ে গেলেও, পারোর নিউ ইয়ার রেসল্যুশান এখনো অটুট, দুপুর বারোটার আগে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুলবে না! বড় টিভিতে ইউটিউবে আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমের এক ঘন্টার মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র ব্যাকগ্রাউন্ডে চালু করে একটা নতুন ইংরেজি কল্পবিজ্ঞানের বই নিয়ে সোফায় বসলো। 

অসাধারণ ট্রিলজি - ক্রনোতন্ত্র, ক্রনোযন্ত্র, ক্রনোমন্ত্র । অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সনাতন অদ্বৈত বেদান্তর কি অসাধারণ মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছেন লেখক! একটু আসতে আসতে বুঝে বুঝে পড়তে হয়, তবেই লেখকের চিন্তাধারা ফুটে ওঠে। তাই রোজ সকাল সকাল  পারো এই বইগুলো পড়ে । দু খন্ড  শেষ হয়েছে, শেষ খন্ডে রহস্য উন্মোচনের আভাস দেখা যাচ্ছে, আর একটু ধৈর্য ধরে এগুলেই এই উইকেন্ডে শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু সে গুড়ে বালি। সাউন্ড মিউট করা থাকলেও, সেলফোনটা ভাইব্রেট করে উঠলো।

"কিরে এত সকাল সকাল?" শিখার প্রোফাইল পিকটা স্ক্রীনে ফুটে উঠেছে।

"টিভিতে খবর শুনেছো ?"

"এত সকালে খবর কোথায়?"

"কাল লেট্ নাইট নিউসে পার্থ সান্যালের সুইসাইডের খবর বেরিয়েছে?"

"কাল রাতে  নেটফ্লিক্সে উইন্টারবটমের  'নাইন সংস' দেখছিলাম ।"

"ওরেঃ বাবা। তাহলে তো আমাদের খোকাবাবুর আর রাতে বাড়ি ফেরা হয়নি।"

"সে আর বলতে! বেশ হার্ডকোর। তার পর কি আর এবিপি আনন্দের  কচকচানি শোনার মুড্ থাকে? যাই হোক, শালা মরেছে ভালোই হয়েছে। অনেক দিন আগেই ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল।"

"কিন্তু এই সুইসাইডটা খুব সাদাসিদে নয়। তাই তোমাকে বলছি।"

"খবরে কিছু বললো?"

"খবরে একটু ধোঁয়া ধোঁয়া বলছিল, তাই আমি আমার বন্ধু তুষারকে  ফোন করেছিলাম।" পারো তুষারকে চেনে, শিখার সঙ্গে এন সি সি করতো। দুজনেই আন্ডার-অফিসার ছিল। পরে কলকাতা পুলিশে চাকরি পেয়ে এখন  সাব-ইন্সপেক্টর পদে আছে।  " ও বলছিল যে কিছু একটা ভৌতিক ব্যাপার আছে।"

"অপরাজিতার আত্মা ওকে মেরে ফেলেছে?"

"তুষারও পুরোটা জানে না। এসব তো ওপরতলার ব্যাপার । তাও কানা ঘুষো ।"

"তা ব্যাপারটা কি? একটু খোলসা করে বল।"

"তুষার আর আমাকে ভালো করে লাঞ্চ খাওয়াও।"

"ঠিক আছে। ক্যালকাটা ক্লাবে চলে আয় । একটায় ।"

--------------------------------------------------

বছর পাঁচেক আগে পার্থ সান্যালের নাম সকলের মুখে মুখে ঘুরতো। একটি উদীয়মান পি-এইচ-ডি স্কলার, যাকে সংবাদ মাধ্যম অপরাজিতা নামেই পরিচিত করেছিল, তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণাগারে  যৌন অত্যাচারের  পর নৃশংস ভাবে খুন হয়। যে বিভাগের গবেষণাগারে এই কান্ডটি ঘটেছিল, সেই বিভাগের প্রধান ছিলেন পার্থ বাবু এবং শোনা যায় যে তাঁর অনেক আর্থিক কারচুপির তথ্য  নাকি অপরাজিতা জেনে ফেলে ছিল। তার ওপর একটা ভালোরকম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ছিল। স্থানীয় এম-এল-এ অরুপ বসাকের নাম এই ব্যাপারে ভালোই জড়িয়ে পড়েছিল। সকলেই বলে  এই পার্থ আর অরুপ পুলিশের ওপর জোর খাটিয়ে পুরো ব্যাপারটা ধামা চাপা পড়িয়ে দেয় ।এক পাতাখোর পাগলকে  দোষী সাজিয়ে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে ফাঁসিয়ে দুই মক্কেল লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। 

অপরাজিতার বিধবা মায়ের সঠিক বিচারের দাবি আর যথার্থ  দোষীদের ফাঁসি দেওয়ার করুন আর্তি সংবাদ মাধ্যমে আর পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়লেও কর্তৃপক্ষ তা সুকৌশলে এড়িয়ে গেছিল। পার্থ আর অরুপের আর্থিক আর রাজনৈতিক বাহুবলে সব প্রতিবাদই একসময় স্তিমিত হয়ে গেছিল। দু-এক জন ছাড়া সকলেই ভুলে গেছিল। 

সকালে শিখার কাছে খবরটা পেয়ে পারো ব্যাপারটা একটু খুঁটিয়ে দেখেছে। গতকাল দুপুরে  অরুপ পার্থর বাড়িতে গিয়ে দরোজায় ঘন্টা বাজিয়ে সাড়া পায়নি। ফোন সুইচড অফ । পুলিশে খবর দিতে তারা দরজা ভেঙে ঢুকে দেখে যে পার্থ একটা ফ্যানের হুক থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বলে ভোর চারটের  নাগাদ মারা গেছে। খবরটা অনেকক্ষন চাপা ছিল, তারপর বিকেল নাগাদ সংবাদ মাধ্যমে বেরোয়। তথ্য এইটুকুই কিন্তু সন্ধ্যার খবরে দেখিয়েছে যে কিছু লোক বেশ আনন্দ করছে - ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, ইত্যাদি ইত্যাদি  ।

"সেটা কিন্তু খুব একটা আশ্চর্য নয়।" পারো, শিখা আর তুষার, ক্যালকাটা ক্লাবের রুম ৭ এর সোফায় বসে কথা বলছে। শিখা  ও তার বন্ধু একটা করে মার্টিনি নিয়েছে আর পারো একটা কাম্পারি । "কেসটা যে ভাবে জোর করে চাপা দেওয়া হয়েছিল, সেটা সত্যিই খুব দুর্ভাগ্যের।"

"পুলিশের কোনো হাত থাকেনা দিদি । আমাদের হাত পা বাঁধা।" তুষার নিজের লোকেদের পিঠ বাঁচাবার চেষ্টা করে।

"তাহলে আর আই-এ-এস , আই-পি-এস কি? এইটুকুই যদি শিরদাঁড়া না থাকে ? সে যাই হোক, পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে কাজ নেই। শিখা বলছিলো যে এর পেছনে নাকি কোনো একটা রহস্য আছে? ডাল মে  কুছ কালা হায় ।"

"এটা আমার জানারও কথা নয়, আর কাউকে তো বলার কথা একেবারেই না, কিন্তু শিখা আমার খুব ভালো বন্ধু বলেই ওকে বলেছি ... " কতটা ভালো বন্ধু সেটা পারো খুব ভালো ভাবেই জানে! শিখার  সঙ্গে ওর ব্যাপারটা যে কতদূর এগিয়েছে সেটা শিখার কাছেই পারো শুনেছে। "যে এই সুইসাইড একেবারে নিজে থেকে হয়নি।"

"কেউ খুন করে সুইসাইড বলে চালাচ্ছে?"

"না না, যতদূর জানি, ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকেই বন্ধ ছিল। অন্য কোনো মানুষ এর মধ্যে থাকতে পারে না।"

"তাহলে কি ভূত? অপরাজিতার ভূত?"

"হাসবেন না দিদি কিন্তু অরুপ বাবু সেই রকমই একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে।"

"রাস্তার লোক টিভিটা এই কথা বলতে পারে কিন্তু আপনি পুলিশের অফিসার হয়ে... "

"আমাকে আপনি বলবেন না ম্যাডাম, শিখার কাছে আপনার অনেক কথা শুনেছি। কিন্তু কালকে যখন লাল বাজারে খবরটা ভাঙলো, আমি কানাঘুষো সেই রকমই শুনলাম।"

"কানাঘুষো ?"

"জানেন তো দিদি, এই কেসটা খুব সেনসিটিভ। একেবারে রাজনৈতিক ওপরতলা থেকে সব কলকাঠি নাড়া হয়। অরুপ বাবু সি-পি-র ঘরে ঢুকে প্রচুর চিল্লাচিল্লি করছিলেন। আমি বাইরে থেকে যা শুনলাম তা থেকে মনে হল যে পার্থ বাবুর ঘরে কেউ ঢুকে ছিল আর সেইটা পুলিশ মানতে পারছে বলে অরুপ বাবু খুব বিরক্ত। স্যারকে যা ঝাড়ছিল আমি হলে তো চাকরি ছেড়ে দিতাম।"

"আর সেই জন্যেই তো তুমি কোনো দিন ওপরে উঠতে পারবে না তুষার! মিনিস্টারের গালাগালি মুখ বুঝে হজম করতে পারাটাই তো ওপরে ওঠার সিঁড়ি। নয়তো দামোদর  সেনের মতো বাজে পোস্টে পড়ে থাকো।"

"কিছু একটা ব্যাপার আছে, সেটা সকলের সামনে বলা যাচ্ছে না। শিখার কাছে যা শুনেছি, এসব ব্যাপার বোধয় আপনিই সমাধান করতে পারবেন।"

কর্তৃপক্ষর অথবা অরুপবাবুর  বোধয় তাই মনে হচ্ছিল। কারন মাসখানেক পরে, সুইসাইডের খবরটা টিভি থেকে সরে যেতেই, পারোর ডাক পড়লো। তবে থানায় নয়, একেবারে পার্থ বাবুর ফ্ল্যাটে। অরুপ বাবুর নিজেদের পুলিশের ওপর খুব একটা ভরসা নেই, তাই তাদের বাদ দিয়ে সরাসরি পারোকে   ডেকে পাঠিয়েছেন। শুধুই পারো আর শিখা। ঘোলাটে রাজনৈতিক ব্যাপারে পুলিশের বড়বাবুরা নিজেদের জড়াতে চায়না।

সল্টলেকে পার্থ বাবুর দোতালা বাড়ি। একতলায় একটা কোচিং ক্লাস চলে, ওপরতলায় একলা থাকতেন। স্ত্রীর সঙ্গে অনেকদিন আগেই ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, পার্টটাইম কাজের লোক আছে, কিন্তু ঘটনার দিন তার ছুটি ছিল। পুলিশ খোঁজ নিয়ে মিলিয়ে দেখেছে যে সেই সময়ে মেয়েটি দু-তিন দিন ছুটি নিয়ে দেশে গেছিল। পার্থ সুইগি থেকে খাবার আনিয়ে চালাচ্ছিলেন। মাঝে মধ্যেই অরুপ আর পার্থ সন্ধ্যাবেলা বসে মদ্যপান করতেন, ঘটনার আগের দিনেও সেই রকমই হয়েছিল।

"আচ্ছা অরুপবাবু পুলিশ তো মোটামুটি স্থিরই করে ফেলেছে যে পার্থবাবু নিজেই গলায় দড়ি দিয়েছেন, তাহলে আবার আমি কি করতে পারি?"

"দেখুন, ন্যাকামি করবেন না।" অরুপবাবু বেশ কিছুটা রেগে গেলেন। "আপনি তো জানেন এই ব্যাপারে পুলিশ নিজে থেকে কিছুই করেনা , যা করার আমরাই করাই । তাই  কাজ না করে করে কাজ করতে ভুলে গেছে।" 

পারোর  হাসি পাচ্ছিলো, ভাবছিলো বলবে  যে তাহলে আপনারাই বলুন, কি করতে হবে? কিন্তু চেপে গেল। আর এটাও দেখলো, যে এই সব কথা অরুপবাবু দেওয়ালের দিকে চেয়ে বলছিলেন। চোখে চোখ রাখতে পারছিলেন না।

"কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যে আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না কি করা উচিত।" অরুপবাবু  কথায় একটা হাঁপের টান ।

"কিন্তু অসুবিধেটা কোথায়? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। একটু পরিষ্কার করে বলবেন।"

"ভূত! পার্থকে ভূতে মেরেছে। " প্রায় চিৎকার করে বললেন। "অপরাজিতার ভূত আর এবার সে আমায় মারবে।"

"এ আপনি কি বলছেন অরুপবাবু !" পারো সত্যিই বুঝতে পারছেনা যে আধুনিক মানুষ কি করে এই কথা বলতে পারে। "এ রকম ধারণা আপনার কি করে হল?"

"তাহলে শুনুন ... আপনারা নিশ্চই জানেন যে ওই মেয়েটার সুইসাইডের পর আমাদের দুজনের, মানে পার্থ আর আমার ওপর কিরকম মিথ্যা রটানো হয়েছিল যে আমরা নাকি দোষী। মিডিয়ায়  মিথ্যা, পথ অবরোধ -- আমাদের রাজনৈতিক শত্রুরা কি না করেছিল  আমাদের অপদস্থ করার জন্য। সৌভাগ্যবসত, আমাদের পুলিশ ঠিক লোককে ধরেই আদালতে তুলে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করেছিল।" প্রায় এক নিঃশাসে এতগুলো কথা বলে ফেললেন অরুপবাবু, কিন্তু খুব উত্তেজিত ভাবে। বেশ হাঁপাচ্ছিলেন।

"সবই মানলাম কিন্তু অপরাজিতার মা কিন্তু এটা মেনে নেননি ।"

"উনি একজন খারাপ মহিলা।" অরুপবাবু রাগে ফেটে পড়লেন। " বিধবা  হলে কি হবে, ওর অনেক ভাতার । ফায়দা তুলতে চায়।"

"সে যাই হোক ।" পারোর এই সব ডাহা মিথ্যে কথা ভালো লাগছিল না। "আসল কথায় আসুন।"

"হ্যাঁ, ব্যাপারটা থিতিয়ে যাওয়ার পর, আমরা যেই একটু শান্তিতে বসেছি, পার্থর ফ্ল্যাটে সে এক  ভৌতিক আওয়াজ, মানে বাণী,  শোনা যেতে । রাত  হলে, মানে  রাত বারোটা বাজলেই সেই অশরীরী গলার শব্দ। স্বপাপেন দগ্ধো’হম্ -- পাপো’হম্, পাপো’হম্। স্বকণ্ঠে পাশঃ --  ঘাতকো’হম্, ঘাতকো’হম্॥ একটানা ভোর চারটে অবধি। সে এক ভয়ঙ্কর শব্দ।"

"স্বকণ্ঠে পাশঃ ... কি ভয়ঙ্কর! শেষ অবধি তাই হলো। নিজের গলায় নিজেই ফাসঁ দিলেন। কিন্তু এই কথা, এই আওয়াজ কোথা থেকে আসতো ?"

"সেটা জানলে কি আর তোমাদের ডেকে আনতাম?" অরুপবাবুর মাথা গরম। অনেক সময় লোকে ভয় পেলে রাগ দেখায়। 

"নিশ্চয় মনের ভুল। নিজের দোষের কথা নিজের মনে  ..."

"একদম বাজে কথা বলবে না।"  তেলে  বেগুনে জ্বলে উঠলো অরুপ । " আমি পার্থ, কেউই দোষী নোই। যত সব মিডিয়ার বানানো গল্প। তা ছাড়া ভিডিও ফুটেজ আছে।" প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে কথা গুলো বললো।

"একটু শান্ত হোন । এত রেগে গেলে শরীর খারাপ করতে পারে।"

তাও অরুপবাবুর রাগ নাবে না। "শরীর খারাপ হবে না? এই সব ভেবে ভেবে তো বুকে ব্যাথা শুরু হয়ে গেল।" একটু জল খেলেন।

"আপনার বোধহয় হার্টের প্রবলেম আছে?"

"হ্যাঁ । শেষ অবধি একটা পেসমেকার লাগাতে হলো।"

"যাই হোক। আপনি  ফুটেজের কথা বলছিলেন? এখানে কি সিসিটিভি আছে?"

"পার্থর বেশ ভালো ইঞ্জিনিয়ারিং স্কিল ছিল। গুগুল হোম লাগিয়ে সারা বাড়ির আলো,  পাখা, এসি, টিভি ভয়েস, মানে মুখের কথায়, কন্ট্রোল করতো। তার সঙ্গে ইদানিং সিসিটিভি লাগিয়েছিল। বাইরে ভেতরে সব জায়গায়। কিছুটা পারানোইড হয়ে গেছিল। সব সময়ে ভাবতো কেউ ওর পেছনে ঘুরছে।"

"এই  সিসিটিভি ক্যামেরায় কি দেখা গেছে?"

"সেইটাই তো খুব সাংঘাতিক। চলো আপনাদের দেখাবো।" কখনো আপনি, কখনো তুমি, বোঝাই যাচ্ছে যে  অরুপবাবু একটু ঘেঁটে রয়েছেন।

"এ ফ্ল্যাটের দেখভাল এখন কি আপনিই করছেন?"

"আমার এখানে বহুদিনের আসা যাওয়া। একটা চাবি আমার কাছেই থাকতো।" বলতে বলতে অরুপবাবু, পারো কে নিয়ে পার্থর শোবার ঘরে ঢুকে গেল। শিখাও পেছন পেছন চললো।



বেশ বড়, সাজানো শোবার ঘর। হোটেল-স্টাইল বেড, মাথার কাছে হেডবোর্ড, ওয়াল টু ওয়াল ওয়াক ইন ক্লোসেট, আর দেওয়ালে একটা বিরাট টিভি। টিভির সঙ্গে হোম থিয়েটার সাউন্ড সিস্টেম।

"পার্থ বাবু তো ভালোই এন্টারটেনমেন্ট সেন্টার সাজিয়েছেন।"

"হ্যাঁ, সিনেমা দেখার শখ ছিল। কলেজ থেকে অবসর নেওয়ার পর মুভি আর ওটিটি ওয়েব সিরিস দেখতো। আমিও প্ৰায়ই আসতাম।" 

"আর সিসিটিভি?"

"বাড়ির নানা জায়গায় ওগুলো পার্থ লাগিয়েছিল । আর এই বড় স্ক্রিনে সব ক্যামেরার ফিড আসে। এইখানেই ও দেখেছিল ওই হারামজাদীকে।" আবার অরুপবাবুর মেজাজের পারদ চড়ছে ।

"এত অবিশ্বাস্য কথা বলছেন । রেকর্ডিং আছে? দেখা যাবে?"

পার্থর যন্ত্রপাতি অরুপবাবু বেশ ভালোই জানেন। রিমোট দিয়ে কয়েকটা সুইচ টিপতেই, স্ক্রিনে ভেসে উঠলো সেই অবিশ্বাস্য ছবি। বাড়ির বাইরে ঘরের সাদা-কালো ভিউ। ক্যামেরার ঘড়িতে দেখা যাচ্ছে সময় রাত দুটো। ঘরে ছোট কোনো আলো জ্বলছে আর আলোআঁধারির ভেতর বেশ দেখা যাচ্ছে এক মহিলা ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে। মুখটা পরিষ্কার বোঝা না গেলেও কোমর অবধি ঝুলে থাকা চুলের ঢল আর দেহের গঠন দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে যে এ সেই অপরাজিতা ছাড়া আর কেউ নয়। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হল যে সেই মহিলা পুরোপুরি উলঙ্গ এবং তার হাতে একটা দড়ি ঠিক ফাঁসি দেওয়ার মতো করে পাকানো। ধীর স্থির পদক্ষেপে সেই উলঙ্গ মহিলা ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেন কাউকে খুঁজছে,  আর হাতের দড়ির ফাঁসটা ঘোরাচ্ছেন। সত্যিই সে এক ভয়াবহ দৃশ্য।


"এ বাবা! ঘরের মধ্যে ফাঁসির দড়ি নিয়ে এ কে ঘুরে বেড়াচ্ছে?"

"দরজা জানলা সব বন্ধ ছিল। ভূত ছাড়া কেউ ওই ঘরে ঢুকতে পারে না"। অরুপ বাবু প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন।

"আর কোনো ভিউ আছে?"

"সব ঘরেই ও ঘুরে বেড়াতো"। সুইচ টিপে অরুপবাবু আর একটা ঘরের ফিড আনলেন। এই ঘরেতেই  পার্থ বাবু শেষে গলায় দড়ি দিয়েছিলেন। অশরীরী মেয়েটি আঙ্গুল দিয়ে সেই কুখ্যাত হুকটা দেখাচ্ছে আর তার পর হাওয়ায় ভেসে সেই হুকেই দড়িটা লাগিয়ে দিচ্ছে। "দেখুন, দেখুন কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য"। অরুপবাবুর গলায় সে এক বিকট আওয়াজ।

"একটু শান্ত হোন অরুপবাবু । আপনার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। কোনো ওষুধ খাবেন?"

"বাড়বে না? এই ছবি দেখে আমার বুক ধুকপুক করে। তাই তো সর্বিট্রেট নিয়ে ঘুরি ।" অরুপবাবু জোরে জোরে নিঃশাস নিচ্ছেন।

"কিন্তু ভূতের ছবি কি ক্যামেরায় ধরা পড়ে?"

"পার্থর মারা যাবার আগের এক সপ্তাহ ধরে ও এই ছবিই রোজ রাতে  দেখেছিল আর সেই ভয়াবহ শ্লোকের আওয়াজ । স্বপাপেন দগ্ধো’হম্ -- পাপো’হম্, পাপো’হম্। স্বকণ্ঠে পাশঃ -- ঘাতকো’হম্, ঘাতকো’হম্॥" অরুপবাবু শরীর আর গলা থরথর করে কাঁপতে লাগল । "আর এবার হয়তো আমার পালা।" অরুপবাবু রীতিমতো হাঁপাচ্ছেন।

"শান্ত হোন , দাদা শান্ত হোন " পারো শিখার দিকে ফিরে বললো, "এই যা একটু জল নিয়ে আয় ।" 

জল খাওয়া হল। কিন্তু অরুপবাবুর কপালে তখনো বিন্দু বিন্দু ঘাম। "দাদা, আপনি এতটা ভয় পাচ্ছেন কেন? আপনার কাছেও কি এমন কোনো কথা  এসেছে?"

"হাঁ । একটা হোয়াটস্যাপ ভয়েস মেসেজ। একই কথা।"

"কে পাঠালো?"

"পার্থর ফোন থেকে! আর ওরই গলায়, একই শ্লোক। একেই আমার হার্টের প্রব্লেম আছে। তার ওপর ই চাপ।" অরুপবাবু হাঁপাতে হাঁপাতে একটা ছোট, সাদা বড়ি পকেট থেকে বার করে জল দিয়ে খেয়ে নিলেন। তারপর চোখ বুঝে একটা বড় করে শ্বাস নিলেন।

--------------------------------------------------

অফিসের কাজে পারোকে কয়েকদিনের  জন্য কোলকাতার বাইরে যেতে হয়েছিল । ফিরে, এয়ারপোর্টে নেবে ফোনে সিগন্যাল পেয়েই ওর ওয়াটস্যাপে একটা মেসেজ ভেসে উঠলো  "ঘোস্ট মিস্ট্রি  ক্র্যাক্ড !" 

পার্থ বাবুর বাড়ির ভৌতিক ঘটনার ব্যাপারটারটা  শিখা আর কল্যাণ, বা ক্রয় এর ওপর অনুসন্ধান করার  দায়িত্ব  দিয়ে  পারো বেরিয়ে গেছিল । মেসেজটা দেখেই ভাবলো যে ক্রয়কে একবার ফোন করে কিন্তু গাড়িতে আর একজন অফিসের সহকর্মী থাকায় সে কৌতূহল চেপে রেখে বাড়ি অবধি এল। লিফটের কাছে ক্রয়ের রয়াল এনফিল্ড মিটিওর ৬৫০ টা দেখে বুঝলো যে ফোন করার আর দরকার হবে না।

পারোর ফ্ল্যাটের চাবি শিখা আর ক্রয়ের, দুজনের কাছেই থাকে। তাই ড্রইং রুমে দুজনকে দুটো হুইস্কি নিয়ে বসে থাকতে দেখে পারো আশ্চর্য হলো না।

"দাঁড়া, ভূতের কথা শুনবো।" নিজের কৌতূহল চেপে, পারো ভেতরে চলে গেল, ফ্রেশ হতে। "আমার জন্য একটা জাম্প সিগনেট সিরাজ ঢেলে রাখ।" গ্রোভারের এই রেড ওয়াইনটা পারোর খুবই পছন্দের। কিন্তু কৌতূহলের চাপে  মিনিট দশেকের মধ্যে ফিরে এল, রাতে শোবার পাজামা সুটটা পরে।

"তোমার কথা শুনে আমার প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিল যে এটা কোনো হ্যাকারের কাজ।"

"তাই ক্রয় আমায় বললো যে ওকে একবার পার্থ বাবুর ডেরায় নিয়ে যেতে।"

"আর শিখার কারেন্ট হার্ট থ্রব, তুষার, অরুপবাবুকে বলে, সেটা ব্যবস্থা করে দিল। তাই আমরা আজ সারাদিন ওখানেই ছিলাম।"

"কি দেখলি? কিসে হ্যাক হয়েছে?"

"পার্থবাবু তো নিজেকে খুবই টেকি মনে করতেন, বাড়িতে এয়ারটেলের ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট কানেকশান, তার ওপর এক্সট্রিম আই পি টি ভি । ওটিটি তে সিনেমা দেখার জন্য। সারা বাড়িতে ওয়াই-ফাই- নেটওয়ার্ক আর তাতে গুগুল হোম দিয়ে নানা রকম যন্ত্র লাগানো।"

"কি যন্ত্র?"

"বড় বড় সাউন্ড সিস্টেম, সিসিটিভি আর তার সঙ্গে ওনার দু তিনটে পার্সোনাল কম্পিউটার।"

"তার মানে তো বিরাট কম্পিউটার নেটওয়ার্ক। লোকটা নিশ্চয় খুব টেকনিক্যালি দক্ষ ছিলেন।"

"কিন্তু এত কিছু করার উন্মাদনায় তিনি প্রাথমিক সিকিউরিটির কথা ভুলে গেছিলেন। আর সেই সুযোগ নিয়েই কোনো এক দক্ষ হ্যাকার হোম নেটওয়ার্ক পেনিট্রেট করে বেশ কিছু ম্যালওয়ার ইনস্টল করে দিয়েছে। আমি আমার ল্যাপটপ থেকে স্ক্যানার চালাতেই সব কটা ধরা পড়ে গেল।"

"অতি বুদ্ধির নাকে দড়ি।"

"সেই ম্যালওয়ার কি করে?"

"কি করে না? সব কিছুই করতে পারে। সব কানেকটেড ইকুইপমেন্ট অপারেট করে। যে কোনো ডিভাইস অন-অফ করা। যে কোনো স্পিকারে যে কোন গান বা এম-পি-৩ ফাইল প্লে করা  ..."

"তার মানে ওই ভয়ঙ্কর শ্লোক বাইরে থেকে কেউ ওই ঘরের স্পিকারে চালিয়ে পার্থ কে ভয় দেখাচ্ছিল।"

"ঠিক তাই। আর তার সঙ্গে সিসিটিভি কন্ট্রোল করছিল।"

"তাইতে  ওই ভূতের ছবি?"

"হ্যাঁ। প্রথমে ওই ক্যামেরার ভিডিও ফিড ইন্টারসেপ্ট করে বাইরে কোথাও থেকে দেখছিল, ঘরে কি হচ্ছে। তারপর সেই ফিডের মধ্যে কোনো মেয়ের ছবি ঢুকিয়ে দিয়েছিল। দুটো ফিড ঘাড়ে ঘাড়ে সুপারইম্পোসড করে হাইব্রিড ছবি স্ক্রিনে পাঠানো হচ্ছিল। তাই পার্থ দেখছিল যে ঘরে মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।"

"এত সাংঘাতিক ব্যাপার। এই ভাবে তো যা কিছু দেখিয়ে দেওয়া যায়। এটা কি  এ-আই মানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের খেলা?"

"এ-আই দিয়ে পুরো ফেক মুভি হয়ে যাচ্ছে আর এটাই বাকি ছিল। একে বলতে পারো অগমেন্টেড রিয়ালিটি।"

"কি জে আসল আর কি যে নকল । শঙ্করের কথায় জগৎটাই মায়া ।"

"অবাক হওয়ার কিছু নেই। সবকিছুই  সম্ভব। তবে কোন খুবই দক্ষ হ্যাকার বা সফ্টওয়্যার  ইঞ্জিনিয়ার এই সব করেছে।"

"শুধু দক্ষই নয়, এমন একজন কেউ যে এই পার্থ বাবুকে মনে প্রাণে ঘৃণা করে।"

"প্রথমটা বলতে পারবো না, কিন্তু এই শহরে দ্বিতীয় ধরনের মানুষের কোনো অভাব নেই।"

"যেই করেছে, ভালোই করেছে। বহু লোকের মনের ইচ্ছে পূরণ করে দিয়েছে।"

"আচ্ছা তুই বার করতে পারবি না কে এই সৎ কাজটি করেছে।"

"সেটা সহজ নয়। কোনো ক্লু বা ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ফেলে না গেলে এটা প্রায় অসম্ভব।"

"আচ্ছা আর একটা ব্যাপার, অরুপবাবুকে  হোয়াটস্যাপ মেসেজ এখন ধমকি দিচ্ছে কে? পার্থর ফোন, পার্থর গলা।"

"ওটা  কোনো ব্যাপারই নয়। যে এত কান্ড ঘটাতে পারে, তার কাছে একটা ফেক হোয়াটস্যাপ হল ছেলের হাতের মোয়া "।

"বুঝলাম, কিন্তু ঘুরে ফিরে সেই একই প্রশ্ন। কি ভাবে হয়েছে তো বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু  কে করেছে ? সেইটাই আসল রহস্য ।"

--------------------------------------------------

ক্যালকাটা ক্লাবের শ্রীমতি রুমে পারো বসে অপেক্ষা করছে। একেই শ্রীমতি রুমটা একটু পেছন দিকে, তার ওপর মঙ্গলবার দুপুর দুটো। ক্লাব প্রায় জনমানব শূন্য। মেম্বার তো নেই, বেয়ারা আব্দারদেরও এই সময় খুঁজে পাওয়া যায়না। তাই প্রাইভেট কথাবার্তার পক্ষে আদর্শ স্থান ও কাল। এবার পাত্র আর পাত্রী এলেই হলো।

পাত্রী হলেন রেখা, রেখা গাঙ্গুলী, অপরাজিতার মা। বিবাহ সূত্রে গাঙ্গুলি হলেও, বিয়ের আগে তাঁর নাম ছিল রেখা রাওয়াত । গাড়ওয়ালী মহিলা, বাঙালিকে বিয়ে করেন এবং কারগিলের যুদ্ধে স্বামীকে হারান। অপরাজিতার জন্ম হয় তার বাবা মারা যাবার ঠিক একমাস পরে । মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে না গিয়ে, রেখা কোলকাতাতেই থেকে যান, শ্বশুরবাড়িতে। অপরাজিতা এইখানেই বড় হয় ও কাছেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়। সেই ভয়ঙ্কর দিন অবধি সবই মোটামুটি ঠিকঠাকই  চলছিল, কিন্তু তার পরেই সব ওলট পালট হয়ে গেল।

দুদিন আগে পারো, পুলিশের কাছ থেকে রেখার ফোন নাম্বার জোগাড় করে ওনাকে ফোন করেছিল।

"গ্লোবাল সাউথ ম্যাগাজিন  থেকে পারোলিকা  মুখার্জি বলছি, দু মিনিট কথা বলা যাবে।" আগের একটা কাজের সময়ে এই নাম একটা ফেক অনলাইন ম্যাগাজিন আর ওয়েবসাইট ক্রয় তৈরী করে দিয়েছিল । নতুন কোনো কাজে নিজের আত্মপরিচয় গোপন রাখার দরকার হলে সেটাকে ঠিকঠাক  আপডেট করে দে । এবারেও তাই হয়েছে।

"বলুন"

"পার্থ বাবুর অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে আপনার সঙ্গে একটু দরকার ছিল।"

"অস্বাভাবিক আর কি?" রেখার গলায় ঘৃণার সুর। "ব্যাটা মরেছে, ঠিক হয়েছে। পুলিশ আর কোর্ট তো ওই হারামজাদাকে ছেড়েই দিয়েছিল। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, নড়েছে।"

"আপনার কি মনে হয়না যে এই ক্ষেত্রে বাতাস ছাড়া আর কেউ হয়তো কলটাকে নাড়িয়েছে?"

"দেখুন আপনার সঙ্গে এই সব বাজে কথা বলার সময় নেই।" বলে ফোনটা দুম করে রেখা কেটে দিলেন। আরো দুতিন বার ফোন করে কোন লাভ হলো না, ফোনটা  রেখা আর ধরলেন না।

ঘন্টা খানেক পরে, সন্ধ্যার দিকে, শিখার ফোন থেকে পারো আবার ফোন করলো। হ্যালো না বলে শুধু চাপা গলায় সেই শ্লোকটা আসতে আসতে শোনালো। "স্বপাপেন দগ্ধো’হম্ -- পাপো’হম্, পাপো’হম্। স্বকণ্ঠে পাশঃ -- ঘাতকো’হম্, ঘাতকো’হম্॥"

কাজ হলো। "কে বলছেন, কি চাই?" পারোর অভিজ্ঞ কানে ধরা পড়লো একটা কৌতূহলের সুর।

"মাপ  করবেন, কিন্তু আমাকে আপনি এত সহজে ঝেড়ে ফেলতে পারবেন না। আমি পারোলিকা , সকালে ফোন করেছিলাম।"

"বলুন, কি চাই?"

"আপনার সঙ্গে একটু দেখা করার ছিল।"

"কেন?"

"ক্যালকাটা ক্লাবে আসুন, সাক্ষাতে সব বলবো।" সম্ভ্রান্ত ক্লাবের নাম করে যদি টেনে আনা যায়।

কিছুক্ষণ বেশ নীরব। আবার কি লাইনটা কেটে দেবে? পারো এই সব ভাবতে ভাবতে পরের বোমাটা মারলো। "আচ্ছা আপনার গতসপ্তাহের প্রেসকনফারেন্সে আপনার ঠিক পেছনে একজন বলিষ্ঠ ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন, লম্বা চওড়া চেহারা, মোটা গোঁফ, চোখে কালো চশমা। উনি কে?"

"ওনাকে আপনার প্রয়োজন কি?"

"না, মানে আপনার সঙ্গে উনিও এলেও খুব ভালো হয়।"

"ভেবে দেখবো।" আবার লাইনটা রেখা কেটে দিলেন।

হোয়াটস্যাপ  করে স্থান ও কাল পাঠিয়ে দিয়ে পারো এখন এক বসে আছে এই পাত্র পাত্রীর অপেক্ষাতেই। নীল টিক পড়াতে বোঝা  যায় যে রেখা মেসেজ পড়েছেন, কিন্তু আসবেন তো? আর সঙ্গে কি আসবেন সেই রহস্য পুরুষ?

বেশিক্ষণ  অপেক্ষা করতে হলো না। নির্ধারিত সময়ের ঠিক তিন মিনিটের মাথায় পারোর ফোন বেজে উঠলো। রেখা রিসেপশন থেকে ফোন করছেন। পারো তাড়াতাড়ি গিয়ে দুজনকে -- হ্যাঁ, দুজনেই এসেছেন -- পথ দেখিয়ে শ্রীমতি রুমের ভেতর নিয়ে গিয়ে বসাল।

রেখা গাঙ্গুলি বছর পঞ্চাশের স্মার্ট মহিলা। ফর্সা টিকোলো পাহাড়ি মুখের গড়ন । পিঠ  অবধি ঘন কালো চুল। একটা ছোট ক্লিপ দিয়ে আটকানো। মেরুন সিল্কের শাড়ি, সাদা স্লিভলেস ব্লাউস। সঙ্গের ভদ্রলোক লম্বা, চওড়া । চাল চলনে একটা ফৌজি ভাব আছে।

"নমস্কার , আমি পারোলিকা, সবাই পারো বলে। আপনাকে চিনলাম, রেখা ম্যাডাম। আর আপনি  ..?"

"মেজর জয়ন্ত মাহাতো, রিটায়ার্ড, সিগনালস রেজিমেন্ট।" সিগনালস! পারোর অঙ্ক মেলার পথে।

"কি নেবেন"

"বিয়ার ইস ফাইন।" কনফিডেন্ট উত্তর, কোনো ধানাই পানাই  নেই। পারো আবদারকে তিনটে কার্লসবার্গ আনতে বলে দিল।

"আচ্ছা রেখা ম্যাডাম, আমি জানি, আমরা সকলেই জানি যে কোলকাতার শহরের বুকে আপনার মেয়েকে জঘন্য ভাবে খুন করা হয়েছিল।"

"শুধু খুন নয়, রেপ এন্ড মার্ডার।"

"মানছি, এবং তার পরে সেটা বেশ জোর করে ধামা চাপা দিয়ে দেয়া হয়েছিল।"

"জানি, কিন্তু আজ আবার সেই কথা কেন?"

"কারণ  আপনি ভালো করেই জানেন যে দুজন প্রাথমিক অভিযুক্তের মধ্যে একজনের কিছুদিন আগে একটা অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।"

"শালা সুইসাইড করেছে।"

"প্রশ্ন হচ্ছে যে এই সুইসাইডে কি কেউ উস্কানি দিয়েছে? কারণ এবেটমেন্ট অফ সুইসাইড টাও একটা অপরাধ।"

"হতেই পারে? তাতে আমাদের কিছু এসে যায় না।"

"কিছু মনে করবেননা রেখা ম্যাডাম, আপনার সঙ্গে মেজর মাহাতোর কি সম্পর্ক? উনি আপনার সঙ্গে কেন আছেন।"

"সেটা নিয়ে আপনার দরকার কি?"

"না, আমরা একটা স্টোরি করছি, জানলে সুবিধা হত।" পারো এতদিনে অনেক কিছুই খবর পেয়ে গেছে। শিখা খোঁজ নিয়ে জানিয়েছে যে রেখার হাসব্যান্ড, রথীন  আর জয়ন্ত এক সঙ্গে পুরুলিয়ার সৈনিক স্কুল থেকে পড়ে, এন ডি এ দিয়ে একসঙ্গে আর্মিতে যোগদান করেছিলেন। একজন গ্রেনেডিয়ার্স  আর  একজন সিগনালস রেজিমেন্ট। কার্গিল যুদ্ধে , লেফটেন্যান্ট রথীন গাঙ্গুলীর বীরগতি প্রাপ্তি হয়  টোলোলিং টপে । আর জয়ন্ত কয়েক বছর পরে, কাশ্মীরে গুরুতর আহত হয়ে প্রিম্যাচিউর রিটায়ারমেন্ট নিয়ে নেন। আপাতত তিনি কলকাতাতেই একটা ছোট আইটি কোম্পানি চালান, বিদেশের সঙ্গে নানা রকম ব্যবসা করেন।

"জয়ন্ত আমার লেট্ হাসব্যান্ডের আর্মির বন্ধু। এখনো আমার সঙ্গে টাচে আছেন, নানা ব্যাপারে আমাকে উপদেশ দেন, সাহায্য করেন।"

"পার্থ বাবুর এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ব্যাপারে পুলিশ যা অনুসন্ধান করছে সে ব্যাপারে আমাদের কাছে কিছু খবর আছে।"

"এখনো অনুসন্ধান করছে? পুলিশের কি আর কোনো কাজ নেই? এত ক্রাইম থাকতে একটা দাগি ক্রিমিনালের সুইসাইড নিয়ে মাথাব্যথা।" পারো চেপে গেল যে এই তদন্ত পুলিশ করছে না, করাচ্ছে আর এক দাগি আসামী । পারো নিজেও  এটাকে একটা পার্সোনাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। এর শেষ দেখে ছাড়বে।

"আচ্ছা অনুসন্ধান করে কি পেয়েছে?" পারো মনে মনে হাসলো। কৌতূহল তো আছেই।

"পুরোটা আমার জানা নেই, তবে যতটুকু শুনেছি, পার্থ বাবুর বাড়ির হোম নেটওয়ার্ক হ্যাক করা হয়। তারপর  ওনার বাড়ির নানা রকম ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে ওনাকে ভয় দেখানো হত ।"

"কি ভাবে ভয় দেখাতো?"

"ওনার সাউন্ড সিস্টেমে ওই একটা শ্লোক বার বাবর বাজতো ।"

"কি শ্লোক?"

"স্বপাপেন দগ্ধো’হম্ -- পাপো’হম্, পাপো’হম্। স্বকণ্ঠে পাশঃ -- ঘাতকো’হম্, ঘাতকো’হম্॥"


"এটা  কি কোন পৌরাণিক শ্লোক?"

"হতে পারে। আমি ঠিক জানিনা। তবে শুনেছি গরুড় পুরাণে এই রকম মৃত্যু বিষয়ক কথা আছে।" পারোর ঠোঁটে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠলো। "অবশ্য মেজর মাহাতোর তো এটা জানা উচিত।"

"বুঝলাম না। আমার জানা উচিত কেন?"

"এই সেদিন যে রেখা ম্যাডাম প্রেস কনফারেন্সে যখন কথা বলছিলেন, তখন তো আপনি ওনার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাই না? একটা নীল চেক শার্ট আর চোখে কালো চশমা পরে।"

"দরকারের সময় উনি সবসময়েই আমার পাশে থাকেন।"

"আর সেইখানেই আমি দেখছিলাম যে আপনি শ্লোকটা আওড়ে চলেছেন।"

" হুঁ  .." কয়েক মুহূর্তের জন্যে ঘরটা স্তব্ধ হয়ে গেল। মেজর সাহেব নির্বিকার কিন্তু রেখার চোখ যে এক ঝটকায় মেজরকে  দেখে নিল সেটা পারোর চোখ এড়ালো না। তার তীর কি লক্ষভেদ করেছে?

"আচ্ছা উনি কি আওড়াচ্ছেন, সেটা আপনি, আপনি শুনলেন কি করে?"

"ভালোই ধরেছেন ম্যাডাম,  মাইকটা ওনার থেকে অনেক দূরে ছিল তাই উনি কিছু বললে সেটা শোনার কোনো অবকাশই ছিল না।"

"তাহলে আপনি কি করে বলছেন যে আমি ওই শ্লোক আওড়াচ্ছিলাম ?"

"শোনা না গেলেও দেখা  যায় স্যার। আর দেখা গেলে, লিপ রিডিং করে বোঝা যায় কি কথা বলছেন।"

"আপনি লিপ-রিডিং করতে পারেন?"

"না। তবে আমার এক সহকর্মী এ সব ভালোই পারে। সেই আমাকে বলে দিল।"

"আপনি কি পুলিশের লোক?"

"না  ..." পারো ঠিক মিথ্যে বললো না, সে অরুপবাবুর কথাতেই এতদূর এসেছে।

"তাহলে আপনার এত ইন্টারেস্ট কেন আমাদের এই ব্যাপারে?"

"কলকাতার প্রায় সবাই এই ব্যাপারে খুবই কৌতূহল। আমার হয়তো একটু বেশি।"

"কিন্তু এটা তো কেউ প্রমাণ  করতে পারবে না?" রেখা মুখ ফসকে বলে ফেললো।

"কি প্রমাণ ? যে মেজর মাহাতো পার্থ বাবুর নেটওয়ার্ক হ্যাক করে ওনাকে ভয় দেখিয়েছেন?"

"এটা আপনার একেবারেই স্পেকুলেশান।" মেজরের গলায় একটা দৃঢ় ভাব। এই গল্প আর বেশিদূর গড়াবেন না । লাভ হবে না। প্রমাণ ছাড়া কিছুই হয় না। আর আপনার ধারণার কোনো প্রমাণ  নেই ।"

"ভুল বললেন। এই রাজ্যে প্রমাণের  দরকার হয়না। পার্টি যা বলবে সেইটাই ধ্রুব সত্য। সেটা তো আপনারা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছেন।"

"আপনি কি আমাদের ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছেন?"

"না। সমস্ত শহরবাসীর মতো আমিও চাই যে অপরাজিতার খুনিদের ফাঁসি হোক, কিন্তু দুএকজন আছে যারা এটা চায়না। তারা চায় যে পার্থ বাবুর খুনিরা ধরা পড়ুক।"

"আপনি কি অরুপের কথা বলছেন?"

"অরুপবাবু কিন্তু খুবই ভীত আর ঘাবড়ে রয়েছেন, আর জানেন তো, জঙ্গলের জানোয়ার ভয় পেলেই আশেপাশের লোকের ক্ষতি করে।"

"ব্যাটা ভয় পেয়েছে।" রেখা  ফেটে পড়লো আর পারো বুঝলো যে  কতটা রাগ আর ঘৃণা উনি পুষে রেখেছেন। "আমাদের মেয়েটার কিরকম ভয় হয়েছিল,কতটা ব্যাথা পেয়েছিল সেটা মনে আছে?"

"চুপ করো রেখা । আমাদের ব্যাথা আমাদেরই।"

"কিন্তু ব্যাটা টিকটিকি লাগিয়ে তোমার  পিছু করেছে।"

"কিস্যু করতে পারবে না। এবার ব্রহ্মাস্ত্র।" সেটা আবার কি রে বাবা? পারোর কপালে বোধয় ভাঁজ পড়েছিল, সেটা মেজরের চোখ এড়ায়নি। 

--------------------------------------------------

পারো পড়েছে বিশাল দ্বন্দে। পুরো ব্যাপারটা কি অরুপবাবুকে বলা উচিত?

"আমার তো মনে হয় চেপে যাওয়াই ভাল। যা হবার হয়ে গেছে। এটা নিয়ে আর বেশি জল ঘোলা করে দরকার নেই।"

"যদি আবার আক্রমণ করে? হোয়াটসাপে তো ধমকি দিয়েছে?"

"কি করবে? মেজর সিগনালসের লোক। আর্মিতে হতে পারে কিন্তু গোলাগুলি ছোঁড়ার লোক নয়, ওয়ারলেস টেলিকম্যুনিকেশান এই সব নিয়ে কাজ করে। সেই জন্যেই তো আই টি কোম্পানি চালায় "

"তুমি জানোনা পারো-দি ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার এখন সবচাইতে সাংঘাতিক অস্ত্র।"

এই নিয়ে তানা বানা করতে করতে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। পারো অফিসের অন্য ক্লায়েন্ট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । শিখার মাধ্যমে তুষারের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে  অরুপবাবু আর কোনো ভয় দেখানো হোয়াটস্যাপ পায় নি। 

অরুপবাবু নিজেও চুপচাপ। পার্থ বাবুর সুইসাইডের চাঞ্চল্যকর খবর,  কোলকাতার সংবাদ মাধ্যমে যে অভাগা অপরাজিতার স্মৃতির ঢেউ তুলেছিল তা ধীরে ধীরে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে । বিধান সভার  ভোট আসছে, অরুপবাবু সেই উন্মাদনায় নেমে  পড়েছেন। তাঁর দলের ওপর যতটা কর্তৃত্ব ছিল, অপরাজিতার খবরের পুনরুত্থানের তা আবার কিছুটা ঢিলে  হয়ে এসেছিল। লোকে কানা ঘুসো  আবার আঙ্গুল তুলছিল। সেসব বন্ধ করতে অরুপবাবু একটু বেশিই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। 

এর মধ্যে তিনি খেয়াল করলেন না যে তাঁর পার্টি অফিসে, যেখান থেকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপ  চালান, সেখানে গোবেচারা গোছের একটা লোক কয়েকদিন ধরে  ঘুরঘুর  করছে। তার একটা ট্রেড লাইসেন্স দরকার কিন্তু ওপার  বাংলা থেকে বেআইনি ভাবে এসেছে, তাই আধার কার্ড, প্যান কার্ড কিছুই নেই। রোজই এসে রাত অবধি বসে থাকে, কিন্তু অরুপবাবু এতই ব্যস্ত যে তাঁর সময় হয় না। আসলে তিনি খোঁজ নিয়েছেন যে এই লোকটি তাঁর কেন্দ্রের ভোটার নয়। তাই তার পেছনে সময় নষ্ট করার মানে হয় না। অরুপবাবুর সঙ্গে দেখা করতে না পারলেও, সে দলের দু একজন ছেলের সঙ্গে দেখা করে, তাদের হাতে কিছু টাকা দিয়ে, লাইসেন্স পাওয়ার অনেক আশা নিয়ে চলে গেছে। আপদ বিদেয় হয়েছে। কিন্তু সে টাকা ছাড়া আরো কিছু রেখে গেছে! 

--------------------------------------------------

আবার উইকেন্ড এসে গেছে। পারোর ফ্ল্যাটে  সন্ধ্যা অধিবেশন বসেছে। ক্রয় আর শিখার সঙ্গে আজ তুষারও এসেছে। মিউসিক আর মদিরা হাজির। মৈথুন হয়তো হবে, তবে তার কিছুটা দেরি আছে। আপাতত সকলে পিৎজার  অপেক্ষায়। কিন্তু উৎসবের আমেজে হঠাৎ একটা ছন্দপতন। তুষারের ফোন বেজে উঠলো। বারান্দায় গিয়ে কলটা নিয়ে তুষার যখন ফিরে এল, ওর মুখটা থমথমে।

"এই তোরা চালিয়ে যা, আমাকে যেতে হবে, বস ডেকেছে।"

"কেন? কি হলো?"

"পার্টি অফিসে অরুপবাবুর মাস্সিভ হার্ট এট্যাক । মারা গেছেন।"

"আমি এটা ভাবছিলাম। হতেই হবে।" তুষার বেরিয়ে যাবার পরেই ক্রয় এই মন্তব্য করলো।

"এরা ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়।"

"কিন্তু কি করে?" পারো এখনো ঠিক বুঝতে পারছে না।

"মনে আছে তুমি সেদিন কি বলেছিলে?  এরা কি করবে? মেজর সিগনালসের লোক। আর্মিতে হতে পারে কিন্তু গোলাগুলি ছোঁড়ার লোক নয়, ওয়ারলেস টেলিকম্যুনিকেশান এই সব নিয়ে কাজ করে।"

"মনে আছে । আর তুই বলেছিলি যে তুমি জানোনা পারো-দি ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার এখন সবচাইতে সাংঘাতিক অস্ত্র।" শিখা জুড়ে দিল।

"সব বুঝলাম, কিন্তু ঘটনাটা কি ভাবে হলো।" পারো বুঝতে পারছে যে তার  হিসেবে ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়ার আগে আরো তথ্য চায়।

"মেজর সিগনালসের লোক হতে পারে, কিন্তু রেখা ম্যাডামের হাসব্যান্ড ছিলেন গ্রেনেডিয়ারস  রেজিমেন্ট আর তার ভেতরের উনি ছিলেন ঘাতক প্লেটুন। যারা সবচাইতে হিংস্র হয়, শত্রুর ওপর প্রথমে ঝাঁপিয়ে পড়ে । প্রেস কনফারেন্সে ওনাকে সেদিন দেখেই মনে হয়েছিল যে উনিও সেরকম কিছু করতে পারেন ।"

"কিন্তু করলো কি করে?"

"সিগনালস, ম্যাডাম , সিগনালস । কদিন ধরেই আমি এই নিয়ে ভাবছিলাম আর গতকালই গুগুল সার্চ করে এই পেপারটা  খুঁজে পেলাম।" বলে নিজের ফোন একটা পিডিএফ ডকুমেন্ট খুললো।


Halperin, D., Heydt-Benjamin, T. S., Ransford, B., Clark, S. S., Defend, B., Morgan, W., Fu, K., Kohno, T., & Maisel, W. (2008). “Pacemakers and Implantable Cardioverter-Defibrillators: Software Radio Attacks and Zero-Power Defenses.” IEEE Symposium on Security and Privacy (Oakland) 2008.

"এটা একটা বড়. পিয়ার রিভিউড জার্নাল পেপার যেখানে দেখানো হয়েছে যে রেডিও সিগন্যাল দিয়ে কি করে হার্টের পেস মেকার অকেজো করে দেওয়া যায়।"

"ওরে বাবা। এতো অসাধারণ হ্যাকার রে বাবা!"

"মনে আছেই, তুমি ওদের সঙ্গে ক্লাবে দেখা করার পর বলেছিল যে মেজর একেবারে শেষে বলেছিলেন যে এবার ব্রহ্মাস্ত্র।"

"সেটা তো ভেবেছিলাম কথার কথা।" পারোর মনে পড়লো সেই কথাটা।

"জানিনা পোস্ট মর্টেম করে এরা কী  বুঝবে, আর কী ঘোষণা করবে, কিন্তু আমার তো কোন সন্দেহই নেই যে নয় পেসমেকারটা বন্ধ করে দেওয়া  হয়েছিল অথবা সেটা এতো জোর করে চালানো হয়েছিল যে শরীর আর সামলাতে পারেনি।"


Comments