কোলকাতার স্নাইপার
রুকসানা বেগম বিরাট পালঙ্কের মোহময় আলিঙ্গন ছেড়ে, উঠে আড়মোড়া ভেঙে, জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ালো।
ধমনীতে ছিটেফোঁটা পশ্চিমি যবনের রক্ত থাকায় নিজেকে বেগম বলে মনে করলেও আসলে রুকসানা খিদিরপুরের নিছক এক প্রভাবশালী ব্যবসাদার। একাত্তরের অরাজকতার সুযোগ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে এসে অর্ধ শতাব্দী ধরে জাঁকিয়ে বসেছে, যদিও তাদের ব্যবসার কোনোটাই ঠিক সোজা পথে চলে না। রুকসানার স্বামী শাহাদাত গাজী বিশ্বাস করতো যে লাঠি টাকা টাকা লাঠি -- লাঠির জোরে টাকা আসে আর টাকার জোরে আরও লাঠি, বন্দুক আর বন্ধু আসে। এই সহজ সত্যের ওপর ভরসা করে সে কোলকাতার বন্দর এলাকায় বেশ একটা বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য তৈরি করেছিল । কিন্তু কিছুটা পারিবারিক গোলযোগের ফলে সে সাম্রাজ্য বেশিদিন গাজীর ভোগ করা হয়নি। সে তার দ্বিতীয় স্ত্রী, মানে রুকসানার সতীনের প্রেমে একটু বেশি পড়ে যাওয়ায়, রুকসানা আর তার ছেলে ইমরান মিলে কলকাঠি নেড়ে তাকে জান্নাতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তারপর মায়ে পোয়ে মিলে বেশ রমরমিয়ে করে খায়। এখন অবশ্য সব কেনা বেচা ধান্দা খুন খারাপি ইমরানই করে, সে তার মাকেও খুব একটা বিশ্বাস করে না । রুকসানাও এসব নিয়ে আর মাথা ঘামায় না, খাওয়া দাওয়া, হীরের গয়না আর OTT দেখা হলেই হল। বাড়ি থেকে বেশি বেরোয় না, চারিদিকে শত্রু অনেক।
ছাত থেকে মেঝে অবধি বিরাট কাঁচের দেওয়াল। মাঝখানে জানলা। জানলার সামনে ছোট্ট দুজনের বসার মতো কফি টেবিল, যদিও আজ চেয়ার একটাই। রুকসানা কাঁচের জানালার সামনে গিয়ে সাদা লেসের পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে জানলাটা খুলে দিল । রুকসানার গায়ে পাতলা একটা লেসের গাউন আর গলায় একটা মহামুল্যের সোনার নেকলেস। খোলা জানলার সামনে বসে সকালের চা খাওয়ার অনেকদিনের অভ্যাস। রাতে ঘরে কেউ এলে, তাকেও সকালে চা খাইয়েই সে ছাড়ে । ঠিক সামনে কোন বাড়ি নেই, দূরে গঙ্গার জলে রোদের আলো চকচক করছে। তবে কিছুটা দুরে একটা নতুন মাল্টিস্টোরিড অফিস বাড়ি তৈরি হয়েছে । কাল রাত্রে ওই বাড়ির ছাদে কী সব নাচ গান হচ্ছিল। কোনো অফিসের কোন প্রোগ্রাম ছিল হয়তো। অনেক লোক, প্রচুর আলো আর আওয়াজ।
অন্য দিনের মতোই রুকসানা জানলা খুলে আবার একটা আড়মোড়া ভাঙলো । তারপর দূরের বাড়িটার দিকে মুখ করে চেয়ারে বসে পড়লো । আর সেইটাই হল বেগমের শেষ বসা । দূর থেকে হঠাৎ ভেসে এলে দুটো গুলির আওয়াজ । তবে সেটা শোনার আগেই বেগমের কপাল আর নাক ফেটে রক্তের ফিনকি বেরিয়ে এল । কোন কিছু বলার অবকাশ পাওয়ার আগেই রুকসানার প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, আর উঠলো না।
▄︻═デ┻┳── ▄︻テ══━一💥
দক্ষিণ কোলকাতার গড়িয়াহাট অঞ্চলের একটা ছোট দোতলা বাড়ির ওপরের তলার বড় ড্রয়িং রুমে প্রজ্ঞাপারমিতা মুখার্জি -- মানে পারো -- একটা সোফার ওপর বসে কাগজ পড়ছে। বাড়িটা পারোর স্বামী, সমীরের, কিন্তু বছর তিনেক আগে সমীর এক কলেজ পড়ুয়া কলগার্লের সঙ্গে একটু বেশি ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে পড়ার জন্যে, পারো তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছে। পারোর বয়েস সবে চল্লিশ পেরিয়েছে । চেহারাটা একটু মোটার দিকে হলেও, লম্বা বলে খুব একটা বোঝা যায় না। পিঠ অবধি লম্বা চুলের দু একটায় সামান্য পাক ধরেছে যদিও তাতে পারোর গ্ল্যামার বা চটক একটু বেড়ে গেছে । খুব অল্প বয়েসে বিয়ে হবার ফলে এক ছেলে বড় হয়ে গেছে । SAT দিয়ে বাপের টাকায় নিউ ইয়র্কে মিডিয়া স্টাডিস নিয়ে পড়ছে। পারোর ইচ্ছে ছিল ছেলে জয়েন্ট দিয়ে IIT IIM পড়ুক কিন্তু সে গুড়ে বালি। বাপ ছেলের কাছে বিদেশে পড়ার ইজ্জত আলাদা। সে যাই হোক, পারো বাড়িতে এখন শান্তিতেই আছে একাই থাকে। তবে ঠিক একাও নয়। সমীর কে তার রাসলীলার মধ্যে হাতে নাতে ধরার জন্য পারো এক তুখোড় কম্পিউটার হ্যাকারকে নিয়োগ করেছিল। কল্যাণ রায় -- যাকে সকলে ক্রয় বলে -- একটি অল্পবয়েসী ছোকরা, কিছুটা আনসোশাল, লোকেদের সঙ্গে, বিশেষত মেয়েদের সঙ্গে, একেবারেই চালাতে পারে না । কিন্তু সে সমীরের ব্যাপারে এমন সব ভয়ঙ্কর তথ্য এমন নিপুণ ভাবে বার করে দিয়েছিল যে সমীরের আর পালানো ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু সেই ফাঁকে সে আর পারো যে কি ভাবে নিজেরাও জড়িয়ে পড়েছিল সে তারা ছাড়া আর কেউ জানে না। না, একজন জানতো। পারোই ক্রয় কে তাদের অফিসের এক কলিগের সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছিল। পারোর পাল্লায় পড়ে ক্রয় কিছুটা মেয়েদের ব্যাপারে হালুচালু হয়ে ছিল, আর সেইখান থেকেই সে মেয়েটি, শিখা বলে এক সাঁওতালি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, এখন ক্রয়ের পাবলিক পার্টনার । কিন্তু পারোর বাড়ির ভেতরে, তাদের একটা নিখুঁত ত্রিকোণ সম্পর্কের বাতাবরণ তৈরী হয়ে গিয়েছিল। এই ঘরোয়া ত্রিকোণের বাইরে অবশ্য একটা প্রফেশনাল ত্রিকোন-ও ছিল। তিন জনেই একটা কনসাল্টিং কোম্পানিতে কাজ করে । পারো ছিল ফরেনসিক একাউন্টেন্ট, টাকা পয়সার কারচুপি সে খুব সহজেই ধরতে পারতো, আর ক্রয় তো হ্যাকার। তবে ক্রয় বেশ ল্যাদ, কম্পিউটার থেকে উঠতে তার বড় কষ্ট। তাই বাইরের কাজে পারো শিখাকে নিয়েই ঘুরতো। তার অবশ্য আর একটা কারণও ছিল -- শিখা কলেজে এন সি সি করতো, দুর্ধর্ষ কারাটে আর মার্শাল আর্টসের ফাইটার। সঙ্গে থাকলে পারো মনে সাহস পায় । তবে এই তিন জনের যুটি , বা ত্রুটি, কোম্পানির বেস্ট পারফর্মিং টিম বলে সকলে মানতো । সেই টিমকেই আজ সকালে পোর্ট থানার ও সি নির্মল ঘোষ ডেকে পাঠিয়েছে। রুকসানা খুনের ব্যাপারে কিছু পরামর্শ করতে।
▄︻═デ┻┳── ▄︻テ══━一💥
সকলে মিলে ভিড় না করে পারো আর ক্রয় এই দুজনেই শুধু থানায় এসেছে, শিখাকে পারো বলেছে এই ব্যাপারে কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড খবর জোগাড় করার জন্য। থানায় পৌঁছে পারো দেখলো যে বড়বাবুর ঘরে রুকসানার ছেলে, ইমরানও বসে রয়েছে এবং মোটামুটি সেই ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। কল্যানবাবুকে দেখতে জাঁদরেল পুলিশ অফিসার হলেও তাঁর খুবএকটা রোল নেই।
"পারো ম্যাডাম, আপনি খুনি শালাকে খুঁজে বার করুন, দু দিনে আমি তার লাশ নাবিয়ে দেব।" বোঝাই যায় যে ইমরানের পুলিশ বা বিচার ব্যবস্থার ওপর বিশেষ ভক্তি নেই। "পোর্ট এলাকায় আমার মা কে কেউ খুন করে বেঁচে থাকবে সেটা আমি হতে দেব না।"
"মিঃ ঘোষ, আপনারা কি কিছু বুঝতে পারছেন?"
"দেখুন, আমি বলছি," ইমরানই যা বলার বলবে। "উল্টোদিকে ইনফিনিটি বলে একটা অফিস বিল্ডিং আছে। ওটা আমাদেরই এক দোস্তের। তিরিশ চল্লিশটা ছোট ছোট অফিস আছে। সেখান থেকেই কেউ গুলি চালিয়েছে।"
"চারটে ফায়ার রিফুজও আছে। সেগুলোর থেকেও ফায়ার করা যেতে পারে।" কল্যাণ বাবু পাশ থেকে বললেন।
"ভেতরে নিশ্চই সিসিটিভি আছে? তার ফুটেজ দেখা হয়েছে?"
"সে আর বলবেন না। মার্ডারের আগের দিন দুপুর থেকে সব ক্যামেরা গুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ।"
"সেকি! কেন?"
"টেকনিক্যাল প্রবলেম। কিন্তু আমরা তো সন্দেহ করছি যে ক্রিমিনালই করেছে। খুব স্মার্ট।"
"ঢোকা বেরোনোর কোন ফিজিক্যাল রেকর্ড আছে?"
"আছে, কিন্তু খুবই গোলমেলে। সেদিন রাতে ছাদে একটা কোম্পানির ইভেন্ট ছিল। প্রচুর গেস্ট, কেটারার, ডেকোরেটর, আর্টিস্ট ঢুকেছে বেরিয়েছে। কি রেকর্ড আছে কেউ জানে না।"
"তাহলে তো কোন ইনফরমেশন নেই।"
"ঠিক তাই, ম্যাডাম। এই জন্যেই ভাবলাম আপনার সঙ্গে একবার পরামর্শ করে নি।"
"আসলে আমিই তো ওদের বললাম, যে আপনাদের দিয়ে কিছু হবে না। আপনারা খালি নেতাদের পেছন পেছন ঘুরুন।" ইমরানের খোঁচা খেয়ে পুলিশ চুপ চাপ হজম করে নিল ।
"আচ্ছা বুলেট টা তো পাওয়া গেছে?"
"হ্যাঁ ম্যাডাম, দুটো বুলেট। ফরেনসিকের কাছে পাঠিয়েছি।"
"ফরেনসিকের পর ব্যালিস্টিক এক্সপার্ট এর কাছে পাঠাবেন। মেক, বোর জানতে হবে। ওইটাই আমাদের আপাতত একমাত্র ভরসা।"
"আচ্ছা আমি একবার ক্রাইম সিনে যেতে পারি?"
"কিচ্ছু নেই ম্যাডাম, গতকাল সকালে মার্ডার হয়েছে, আমাদের ফরেনসিক গিয়ে সব দেখেছে। তার পর সব ধুয়ে মুছে সাফ। আর কিছুই পাবেন না।"
"তাও ম্যাডাম যদি যেতে চায়, আমিই নিয়ে যাব।" ইমরান নিজেই অফার করলো। "আপনাদের আর আসতে হবে না।"
"আচ্ছা, আমি একটু সিসিটিভি গুলো দেখতে পারি?" এতক্ষন চুপ থেকে ক্রয় মুখ খুললো।
"আমাদের সাইবার সেলের কোনো অফিসার তো এখানে এখন নেই।"
"আরে আপনাদের সাইবার সেলের মাথায় মারো ঝাড়ু।" পাশ থেকে ইমরান খ্যাঁক করে উঠলো। "আমার লোক দিয়ে আমি ওনাকে ইনফিনিটি বিল্ডিংএ পাঠিয়ে দিচ্ছি। ও সব ব্যবস্থা করে দেবে।"
▄︻═デ┻┳── ▄︻テ══━一💥
ইমরানের বাড়ি মোটামুটি একটা গড় আর প্রাসাদের মেলবন্ধন । যেমন বৈভব তেমনই সুরক্ষিত। পাঁচতলায় ইমরানের এলাকা, ওর বৌ বাচ্চা থাকে। তাদের পাশ কাটিয়ে পারো কে নিয়ে ইমরান একেবারে ছতলায় চলে এল, যেখানে রুকসানা থাকতেন আর খুন হয়েছিলেন।
"বেগম এই ঘরেই শুতেন? একলাই ?"
"হ্যাঁ একলাই থাকতেন, তবে কখনো কখনো রাতে ওনার " কথাটা ইমরান হাওয়ায় ছেড়ে দিল।
"মানে রেগুলার কোন সার্ভেন্ট বা অন্য কেউ নয়।"
"না, সকাল হলে, উনি উঠেছেন দেখলে একজন কাজের বিবি আছে চা দিয়ে যেত।"
"কি করে বুঝতো যে উনি উঠেছেন?"
"ঘরে একলা থাকলে দরজা খোলাই থাকত। কাজের বিবি বুঝতে পারতো যে কখন উনি উঠেছেন।"
"মারা যাবার দিনও কি সেই কাজের বিবি ঘরে ঢুকেছিল?"
"হ্যাঁ ওই তো ডেড বডি দেখে হাউমাউ করে আমাদের ডাকলো। তার সঙ্গে কথা বলতে চান?"
"না, দরকার হলে বলবো। আচ্ছা ওই ছবি গুলো কাদের?" দেওয়ালে তিনটে ছবি ।
"ওঃ আমার মা, নানা আর নানী। আসুন না দেখুন।"
মাঝে রুকসানার অল্পবয়েসের ছবি, টানা টানা চোখ, কোঁকড়া চুল। গলায় একটা সোনার নেকলেস। পাশের ছবিতে একজন বয়স্ক লোক, ষণ্ডাগুণ্ডা চেহারা। দুজন ফৌজি লোকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে একটা বড় ঝিলের ধারে।
"এই জায়গাটা কোথায়?"
"ওটা চলন বিল, বগুড়ার কাছে। রাজশাহী জেলা।আমার নানা নানীর ভিটা ছিল ওখানে"
"মানে আপনারা ওপার বাংলার লোক ?"
"না না, আমার মায়ের বাড়ি ওদিকে," ইমরান একটু থমকে গেল, "মানে আমাকে আপনি বলবেন না। আই আম জাস্ট ইমরান।"
"আপনার মায়ের গলায় একটা হার দেখলাম। বেশ সুন্দর। খুব ইন্টারেস্টিং।"
"ওটা উনি সবসময় পরে থাকতেন।"
"সেটা কি একবার দেখা যাবে?"
"আসলে মার্ডারের সময় ওটা ওনার বডিতে ছিল। পুলিশ নিয়ে গেছে। আমি ওটা নিয়ে আসবো । তখন নিশ্চই আপনাকে দেখাবো।"
"আচ্ছা বেগম কি এই টেবিলেই বসে চা খাচ্ছিলেন? আমরা একটু বসতে পারি?"
"শিওর। একটু চা খাবেন? নাকি উড ইউ লাইক আ বিয়ার?"
"কাজে বেরিয়ে খাইনা, কিন্তু এই জায়গাটা এত সুন্দর।"
"শিওর লেট্ মি গেট সম।"
"চিল্ড ক্যান হলে ভাল হয়। আর আপনার বাড়িতে কি একটা দূরবীন বা বাইনোকুলার হবে? তাহলে ওই বাড়িটা দেখতাম।"
"আছে। দেখছি।" বলে ইমরান বেরিয়ে গেল। আর সেই ফাঁকে পারো নিজের ক্যামেরায় সেই তিনটে ছবির ছবি তুলে নীল।
বিয়ার এল, খাওয়া হল। ইনফিনিটি বিল্ডিং নিরীক্ষণ করা হল। পারো ঘুরে ঘুরে সারা ঘরটাও দেখলো।
"ম্যাডাম, কিছু ক্লু পেলেন?"
"না। সবই তো ক্লিনড আপ। তবে একটা সাজেশন আছে, জানিনা পুলিশ কি করবে না করবে।"
"আমাকে বলুন ।যে আমার মাকে মেরেছে তাকে আমি ছাড়বো না। প্লাস এটা প্রেস্টিজের ব্যাপার। আমার মা খুন হয়ে গেলে আমার পজিসন এলাকায় ঢিলে হয়ে যাবে। লোকেরা ভাববে ইমরানের দম আর দিন দুটোই শেষ। তাহলে আরো বিপদ।" পারো বুঝলো যে মায়ের শোকের চেয়ে নিজের জায়গা ঠিক রাখার জন্য ইমরান উদগ্রীব।
"দেখুন শ্যুটার প্রায় ৮০০ মিটার দূর থেকে মেরেছে।তার মানে স্পেশালিস্ট স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করেছে । তার স্পেশাল বুলেট হবে। কে এই ধরণের বুলেট কিনেছে? সেটা বেরোলেই আমরা কিন্তু অনেক কাছে পৌঁছে যাব।"
▄︻═デ┻┳── ▄︻テ══━一💥
পরের দু তিন দিন সব চুপ চাপ। কোন খবর নেই। পারোর ত্রুটি এদিক ওদিক খোঁজ করছে কিন্তু সে রকম কোনো ব্রেকথ্রু হবার কোন লক্ষণ নেই। তিনদিনের মাথায় একটা খবর এল। বন্দর এলাকায় ভোর রাত্রে একটা বড় হাঙ্গামা হয়েছে। সাধারণ শহর বাসীর কাছে এটা একটা গ্যাং ওয়ার মনে হলেও পারোর কাছে ব্যাপারটা একটু সন্দেহজনক ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হল। থানার ওসি কে ফোন লাগলো।
"ম্যাডাম, আপনি আর এই ব্যাপারে থাকবেন না," মিঃ ঘোষ চাপা গলায় পারোকে সাবধান করে দিল।"ইমরানের কাজ হয়ে গেছে।" বলে লাইনটা কেটে দিল।
রহস্য উৎঘাটন হল সেদিনই সন্ধ্যা বেলায়। একটা মাস্কড নাম্বার থেকে ফোন। পারো ধরবে না ধরবে না করেও শেষে ধরলো। ওদিক থেকে ইমরানের গলা । "ম্যাডাম, আপনার বুদ্ধি একেবারে ঠিক। শালাকে উড়িয়ে দিয়েছি।"
"মানে?"
"খবরে পড়েছেনতো ইদ্রিসের গোডাউন খতম, ওর বড় ছেলে আর তিনটে গানম্যান জান্নাতে।"
"কেন?"
"আপনার একেবারে পারফেক্ট বুদ্ধি। স্নাইপার বুলেট কে কিনেছে? কলকাতার সব বন্দুক দুকানে খোঁজ লাগলাম। নার্সিং দাঁ এর দোকানে ওই বুলেট কেনা হয়েছে। বুলেট কিনলে আই ডি প্রুফ লাগে। ইদ্রিসের ছেলে শালা মাসুদ, ওর সাঙ্গাৎ হাবিব বুলেট কিনেছে ড্রাইভার্স লাইসেন্স দেখিয়ে। ব্যাস দুয়ে দুয়ে চার । বুঝলাম কে আমার মা কে মারিয়েছে। ওর সঙ্গে আমার একটা বড় দুশমনি চলছিল, তাই ও আমাকে চমকাল ।"
"তারপর?"
"নাবিয়ে দিলাম আমার লোককে। ধুয়ে মুছে সাফ?"
"কিন্তু ওরা তো এর আবার বদলা নেবে? আপনাকে সাবধানে থাকতে হবে।"
"চিন্তা করবেন না। কিন্তু আপনাকে আমার তরফ থেকে একটা তোফা দেওয়ার আছে। পুলিশ কিছুই করছিলো না আপনি আমার পুরো মান বাঁচিয়ে দিয়েছেন।"
"না না, আমার তোফা চাই না। আপনার কাজ হয়েছে তাইতেই খুশি।"
▄︻═デ┻┳── ▄︻テ══━一💥
"কি পারো দি তুমি তো ফাটিয়ে দিয়েছো! ফার্স্ট শটে বুলস আই ।" শিখা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল এই খবর শুনে।
"না রে আমার কাছে এই অঙ্ক মিলছে না। ডাল মে কুছ কালা হায় ।"
"কেন? তোমার পথেই তো এটা ও সলভ করেছে।"
"আচ্ছা এই ইদ্রিস, মাসুদ, হাবিব কি এতই বোকা? নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে স্নাইপার বুলেট নিজেদের দিকে তীর ঘুরিয়ে রেখে যাবে? এ যেন কেউ প্যান্ট নাবিয়ে, পেছন ফিরে বলছে এস, ….. " বাকিটা পারো আর মুখে বলল না।
"তাহলে গল্পটা কি ?"
"না। এটা অন্য কেউ করেছে। যে আসল খুনি, সে ওদের দিকে পুলিশের নজর ঘুরিয়ে দিচ্ছে।"
"কে সে?"
▄︻═デ┻┳── ▄︻テ══━一💥
"পারোদি , একটা খবর আছে।" ক্রয়ের মুখে মুচকি হাসি । "আচ্ছা, তুমি বগুড়ার কাছে চলন বিলের কথা বলছিলে না?।"
"হ্যাঁ ইমরানের মায়ের বাবার একটা ছবি দেখেছিলাম ওর ঘরে। সেটা ওই খানে তোলা। তার সঙ্গে কি যোগ?"
"আমি ওই ইনফিনিটি বিল্ডিঙের সিসিটিভি ক্যামেরার বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়ে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম। খুব বুদ্ধিমানের মত কোনো তার ছেঁড়া সুইচ বন্ধ কিছুই করে নি।"
"তাহলে ক্যামেরা বন্ধ হল কি ভাবে?"
"একটা কম্পিউটার ভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়েছে, অফিসের কাউকে ই-মেল করে লিংক পাঠিয়ে দিয়ে।"
"তুই জানলি কি করে?"
"কি করে আবার? আন্টি ভাইরাস স্ক্যানার চালিয়ে দেখলাম সব মেশিনে আর ক্যামেরায় বসে আছে মিরাই নাম এক জাপানি ভাইরাস । আসলে এগুলো বট মানে দূর থেকে কন্ট্রোল করা যায়, ক্যামেরা অন ক্যামেরা অফ ।"
"এত আমাদের মেটিয়াবুরুজের হাবিব মিয়াঁর কম্ম নয়।"
"কারুরই নয়। যে করেছে তাকে অনেক সার্চ করতে হয়েছে, ডার্ক ওয়েবের ডিসকাশন গ্ৰুপে হেল্প চাইতে হয়েছে। আর সেইখানেই তার পদ চিহ্ন রয়ে গেছে।"
"কে সে?" পারো উদগ্রীব।
"ডার্ক ওয়েবে কেউ নিজের নাম দেয় না। লগ ইন করার সময় ফেক হ্যান্ডেল ব্যবহার করে। মিরাই ভাইরাসের ব্যাপারে দেখলাম যে 'কাল যোগলা' বলে একটা হ্যান্ডল খুব উৎসাহী। অনেক জায়গায় প্রশ্ন করছে।"
"বাবা, 'কাল যোগলা'! সে আবার কে?"
"গুগল সার্চ করলে দেখবে যে 'কাল যোগলা' বলে মুঘল আমলে এক ভয়ঙ্কর ডাকাত ছিল, পণ্ডিত ডাকাতের উত্তরসূরি, যুগল কৃষ্ণ সান্যাল। আর তার ভিটা ছিল এখনকার বাংলাদেশের বগুড়ার কাছে চলন বিলে এ ।"
"ওঃ কি করেছিস রে ক্রয় ! এত ফাটিয়ে দিয়েছিস।" এই বলে পারো তার খুদে হ্যাকার কে জড়িয়ে ধরে চকাস করে একটা চুমু দিয়ে দিল। "এবার লোকটার আসল নামটা বার কর ... তাহলেই .. "
"তাহলেই কি দিদি?" শিখা মুচকি হাসে।
▄︻═デ┻┳── ▄︻テ══━一💥
পরের শুক্রবার সকালে আবার ইমরানের ফোন। "পারো ম্যাডাম এই স্যাটারডে আপনাকে আমাদের গেস্ট হাউসে আসতে হবে। একটা পার্টি দিচ্ছি আপনার খাতিরে।"
"আপনি কি আমায় প্রাণে মারবেন না কি? যদি খবর বেরোয় যে আমার বুদ্ধিতে মাসুদ আর হাবিব মরেছে, তাহলে আমি আর এই শহরে থাকতে পারব না।"
"ঠিক আছে, আপনার নাম কেউ করবে বা, জানবেও না। আমরা পার্টি করব। আপনি এসে আমাদের সঙ্গে এনজয় করবেন।"
"আপনারা পার্টি করুন, আমাকে ছেড়ে দিন না।"
"বিলকুল নেহি। আপনার মত ব্রিলিয়ান্ট আর বিউটিফুল লেডির সঙ্গে এক দিন না নাচলে আমার জিন্দেগী বৃথা হয়ে যাবে। আর আপনার জন্য স্পেশাল তোহফা আছে।"
"কি আবার?"
"আপনি আমার মায়ের নেকলেস দেখতে চেয়েছিলেন? আমি পুলিশের কাছ থেকে ওটাকে ছাড়িয়ে এনেছি, আপনাকে দেখাবার জন্যে ।"
এইটা দেখার লোভ পারো ছাড়ে কি করে?
▄︻═デ┻┳── ▄︻テ══━一💥
কোলকাতার থেকে ডায়মন্ড হারবারের দিকে যেতে গেলে, জোকার পর রাস্তার দু ধারে অনেকগুলো রেস্টোরেন্ট, রিসোর্ট আছে যেখানে নিরিবিলিতে, লোকের চোখের আড়ালে বেশ ভালোই ফুর্তি করা যায় আর এই রকমই একটা জায়গায়, পারো এসেছে ইমরানের আমন্ত্রণে। একলা আসেনি, সঙ্গে শিখাকে এনেছে। শিখা থাকলে সে মনে একটু ভরসা পায় । তা ছাড়া শিখাই ওদের ড্রাইভ করে এনেছে, ওদের অফিসের মাহিন্দ্রা থর গাড়িটায়।
সাধারণত সান্ধ্য পার্টিতে পারো শাড়ি পরেই যায় কিন্তু আজ সে জিন্স পরেছে । প্যান্টটা একটু টাইট হয়ে গেলেও, জ্যাকেটটা বেশ কম্ফোর্টেবল, যদিও ভেতরে একটা হল্টার নেক টপও আছে। কম্বো-টা বেশ হট! শিখা তো বলেই ফেললো, "পারো-দি তুমি কি ইমরানকে নাচাতে যাচ্ছ?"
পার্টিটা মোটামুটি ইমরানের দলের লোকেদের জন্য। সবাই গুন্ডা টাইপ পুরুষ, মহিলা বলতে পারো, শিখা আর স্টেজের ওপর তিনটে অর্ধনগ্ন গায়িকা । প্রচুর ঝিকিমিকি ডিস্কো লাইটের আলোয়, রগরগে গানের তালে তালে সকলেই বেশ ভালো রকম ছড়িয়ে নাচছিল । পারো আর শিখা অবশ্য ধারের টেবিলে বসেই বিয়ার খাচ্ছিল, যদিও একবার ইমরান পারোকে হাত ধরে টেনে ডান্সফ্লোর নিয়ে গেছিল আর সেই ফাঁকে তার দু একটা স্যাঙাত, পারোর পাছায় হাত বুলিয়ে দিল ।
রাত গভীর হচ্ছে দেখে পারো গিয়ে ইমরানকে তার তোহফার কথাটা মনে করি দিল। তখন ইমরান ওকে ডেকে নিয়ে পাশের একটা ঘরে গিয়ে ঢুকলো । শিখাও ওদের সঙ্গে গেল। ছোট একটা প্রাইভেট ঘর, শুধু একটা ঝাড় লণ্ঠনের আলোয় আধা আঁধারি। দুটো সোফা একটা টেবিল, তার ওপর শ্যাম্পেনের বোতল, দুটো ক্রিস্টালের গ্লাস। "একটু শ্যাম্পেন হয়ে যাক?"
"নেকলেস কোথায়?"
"এই দেখ সুইটহার্ট," বলে ইমরান পকেট থেকে নেকলেস টা বের করে পারোর হাতে দিল।
"এত মহামূল্য, প্রাইসলেস।" পারো অবাক হয়ে দেখছে। আর সেই ফাঁকে ইমরান পারোকে জড়িয়ে ধরে জোর করে একটা চুমু খেল।
"ধ্যাৎ " আকস্মিক অযাচিত চুমুতে বেশ বিরক্ত হয়ে পারো ইমরানকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিল। আর তাই সেবারের মতন ও প্রাণে বেঁচে গেল। কারন সেই মুহূর্তেই দুজন লোক দরজায় লাথি মেরে ঢুকে ইমরান কে তাক করে গুলি চালালো।
"শালা ইদ্রিস তুম ।" এর ছেলে মাসুদকেই ইমরান কদিন আগে খুন করিয়েছে।
"হাঁ চুতিয়া মাদার* ইমরান, হামারা বেটাকো তুম মার ডালা।" বলে আবার গুলি।
পারো একেবারে থতমত খেয়ে গেলেও, শিখার রিফ্লেক্স সাংঘাতিক। সে শ্যাম্পেনের বোতলটা তুলে ঝাড়লণ্ঠনে ছুঁড়ে মারল। সেটা ঝনঝন করে ভেঙে পড়ে ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল । এই অন্ধকারের ভেতরই ইমরানের লোক জন পৌঁছে গিয়েই বিরাট হৈহট্টগোল গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। সেই ফাঁকে, শিখা পারোকে হাত ধরে টেনে নিয়ে পালালো।
▄︻═デ┻┳── ▄︻テ══━一💥
পারোর বাড়িতে মিড নাইট মিটিং। ক্রয়, শিখা আর পারো আর তিনটে লার্জ টালিস্কার সিঙ্গল মল্ট। গল্প জমে উঠেছে।
"ওঃ শিখা যদি বোতল ছুঁড়ে আলোটা না ভাঙতো তাহলে আমাদের আজ এই সিঙ্গল মল্ট হতো না।"
"তুমি সাহস করে না গেলে, আজ এই নেকলেসটা আমাদের হাতে আসতো না।" পারো বুদ্ধি করে পালাবার সময় নেকলেস তা পকেটে পুরে নিয়েছিল।
"জানিনা এর আর কোন দাবিদার আছে কিনা, কিন্তু আপাতত এটার কথা পুলিশকে বলবো না।"
"কিন্তু আমিও হাত গুটিয়ে বসে ছিলাম না পারো দি," ক্রয় হেসে বললো। "আমাদেরও এদিকে একটা ব্রেকথ্রু হয়েছে।"
"বলে ফেল।"
"ডার্ক ওয়েবে লোকে নানা রকম হ্যান্ডল ব্যবহার করে। 'কাল যোগলা' ডাকাতের এক জুটি ছিল, 'কাল চাঁদেয়া ' দুজনই পণ্ডিত ডাকাতের উত্তরসূরি। 'কাল চাঁদেয়া' দিয়ে সার্চ করতে দেখলাম সেও মিরাই ভাইরাস নিয়ে খুব পড়াশুনো করছে। একই লোকের দুটো হ্যান্ডল ।"
"কিন্তু আসল লোক কে?"
"'কাল চাঁদেয়ার ' হোম টাউন হিলি।"
"হিলি? সে তো রাজশাহীর কাছে সীমান্ত শহর । একাত্তরের যুদ্ধে ব্যাটল অফ হিলি খুব বিখ্যাত।"
"এক্সাক্টলি। আর কাল চাঁদেয়ার প্রোফাইল পিক হলো একটা গরুড় । গরুড় হল আর্মির ৮ গার্ডস ব্যাটালিয়নের চিহ্ন আর এই ৮ গার্ডস, ব্যাটল অফ হিলি তে লড়েছিল। ব্যাটেল অনার্স হিলি পেয়েছিল। আর হিলি দিয়েই ওরা বগুড়া পৌঁছেছিল "
'তাহলে আমাদের স্নাইপার তো ওই ব্যাটালিয়নের লোক হতে পারে। এবার তাকে কলকাতায় খুঁজতে হবে।"
"আর্মি রেকর্ডস হ্যাক করা খুব শক্ত। কিন্তু কোলকাতায় থাকা সব সারভিং আর রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার অর্ডন্যান্স ক্লাবের মেম্বার। ক্লাবের মেম্বার্স ডিরেক্টরিতে জ্বল জ্বল করছে রিটায়ার্ড কর্নেল শিব স্বরূপ শর্মা। ৮ গার্ডস রেজিমেন্ট, একাত্তরের যুদ্ধে সেনা মেডেল পেয়েছিলেন। এখন গ্রূপ ৩৯ সিকুইরিটি সার্ভিসেসের অ্যাডভাইসারি বোর্ডে আছেন।"
"ওরে বাপরে বাপ ! এর তো বয়েস হয়েছে। এ কি গুলি চালাতে পারবে?"
"ইনি নর্থ ক্যালকাটা রাইফেল ক্লাবের লাইফ মেম্বার। মাসে অন্তত তিনবার প্র্যাকটিস করেন।"
"তাহলে তো আর কোন কথাই রইল না। এই খুনি। ক্রয় তুই বাজি মাত করে দিয়েছিস।" শিখার সে কি উচ্ছ্বাস।
"এত হেসো না দিদিমনি। হতে পারে এই স্নাইপার , কিন্তু কোর্টে দেওয়ার মত এক চুলও এভিডেন্স নেই। পারফেক্ট ক্রাইম। কিন্তু কেন? কেন? কেন? "
▄︻═デ┻┳── ▄︻テ══━一💥
অর্ডন্যান্স ক্লাবে পারো আজ একাই এসেছে। কর্নেল শর্মার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করাতে প্রথমে তিনি পারোর সঙ্গে দেখা করতে রাজি হচ্ছিলেন না । কিন্তু 'কাল চাঁদেয়ার ' আর 'কাল যোগলা' র বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করাতে তিনি খুব তাড়াতাড়ি মত বদলে বললেন দুপুরে ক্লাবে চলে আসতে ।
পারো ক্লাবের জ্যাম্বোরি লাউঞ্জে ঢুকে দেখলো যে এক বয়স্ক ভদ্রলোক তার জন্য অপেক্ষা করছেন। লম্বা, চওড়া, জিম করা চেহারা, এক মাথা সাদা চুল, খুব ছোট করে কাটা। একদম মিলিটারি ছাঁট। সঙ্গে এক স্মার্ট মহিলা, বয়েস হবে ষাটের কোঠায় কিন্তু বেশ ফিট ফাট, সপ্রতিভ।"আমি কর্নেল শর্মা, ইনি শকুন্তলা।" কিন্তু তাদের যে কি সম্পর্ক সেটা কিছু বললেন না। নিজে একটা হুইস্কি আর দুই মহিলার জন্যে দুটো মার্টিনি অর্ডার করে জিজ্ঞেস করলেন। "কি জানতে চান বলুন।"
পারো আসতে আসতে পুরো গল্প আর তাদের বিশ্লেষণটা বোঝালো। রুকসানার খুন, রুকসানার ঘরে চলন বিলের ছবি, রুকসানার বাবার সঙ্গে ৪ ফ্রণ্টিয়ার ফোর্সের বিউগল চিহ্ন ওয়ালা পাকিস্তানি অফিসারদের ছবি, ইনফিনিটি বিল্ডিঙে মিরাই ভাইরাস, মিরাই ভাইরাসের খোঁজে 'কাল চাঁদেয়া ' আর 'কাল যোগলা', 'কাল চাঁদেয়ার ' হিলি তে বাসস্থান আর গার্ডস রেজিমেন্টের চিহ্ন দেওয়া প্রোফাইল পিকচার, ৮ গার্ডসের শ্যাম স্বরূপ শর্মা বীরত্বের গাথা আর শেষ অবধি কর্নেল শর্মার রাইফেল ক্লাবে প্রাকটিস। "অঙ্ক কি মেলাতে পারলাম?" বলে পারো হাসলো ।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কর্নেলও হাসলেন । "অঙ্ক মিলুক কি না মিলুক, গল্পটা ভালই ফেঁদেছেন ।" পুজোবার্ষিকীতে পাঠিয়ে দিন। ছেপে দেবে।"
"আমার পুজোবার্ষিকীতে কোন আগ্রহ নেই। আমি খালি জানতে চাই আপনি কেন এই খুনটা করলেন? কি কারণে আপনার মত একজন ডেকোরেটেড অফিসার একটা ক্রিমিনালকে মেরে ফেললো। নিশ্চয় এর পেছনে কোন অসাধারণ গল্প আছে।"
"আপনার কোন প্রমাণ নেই, কেন আপনাকে আমি কিছু বলবো?"
"মানছি। পারফেক্ট ক্রাইম। আমার কিউরিওসিটি। আর এই কাহিনীটা শোনাবার জন্য আমি আপনাকে একটা গিফট দিতে পারি ।"
"কি গিফট?"
"যদি বলি যবনমর্দিনী কালির গলার নেকলেস?"
কিছুক্ষন সকলে চুপ। তারপর মহিলা বললেন, "হাতে হাতে দিতে পারবেন?"
পারো ব্যাগ থেকে নেকলেসটা বার করে টেবিলে রাখলো। "এটা আমি আপনাকে উপহার দিলাম। এবার যদি দয়া করে গল্পটা শোনান।"
মহিলা নেকলেস টা নিলেন, দেখলেন, তারপর বুকে চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। একটু ধাতস্থ হলে ধীরে ধীরে গল্পটা বললেন।
পাকিস্তানী আর্মির অত্যাচারের তাড়া খেয়ে শকুন্তলা তার মা আর বাবা ভারতের সীমান্তের দিকে
পালাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিল যবনমর্দিনী কালির মূর্তি আর গয়না । তাঁরা ছিলেন যুগল কৃষ্ণ সান্যালের বংশধর। পণ্ডিত ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত যবনমর্দিনী কালির সেবায়েত। রুকসানার বাবা মন্দিরে কাজ করতো আর সে আর তার মেয়ে, যাকে শকুন্তলা দিদি বলতো, তারা পথ দেখিয়ে ভারতে পৌঁছে দেবে বলেছিল। কিন্তু দেয়নি । বেইমানি করে তারা তাদের পাকিস্তানি আর্মির হাতে তুলে দেয় । শকুন্তলার চোখের সামনে, ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের পাষন্ডরা তার বাবা কে খুন করে। তার পর যখন তার মাকে উলঙ্গ করে রেপ করছে তখন দেবদূতের মতো উদয় হয় কর্নেল শর্মার সি-কোম্পানি।
"আমি তখন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট, আসল যুদ্ধ শুরু হবার ঠিক আগে রেকনিশান্স পেট্রোল করছি । দেখি শালা ৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের জওয়ানরা দুটো বাঙালি মেয়েকে টর্চার করছে। ওরা কিছু বোঝার আগেই বন্দুক চালিয়ে সকলকে খতম করে দিলাম। কিন্তু শকুন্তলার মা কে বাঁচানো গেল না।"
"তার পর অনেকে জল গড়িয়েছে, অনেক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ভারতে পৌঁছে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট শর্মা আমার হাত ধরে বলেছিলেন যে এর বদলা একদিন নেওয়া হবে। আজ কর্নেল শর্মা " ... এই বলে শকুন্তলার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠলো কিন্তু আর কোন কথা বেরুলো না।



Comments