থোরিয়ামের নেকলেস
শিখা আর পারো -- পারোলিকা মুখার্জি -- দুজনেই জেমিনি কনসাল্টিং কোম্পানিতে কাজ করে। পারো ফরেনসিক একাউন্টেন্ট, টাকা পয়সার কারচুপি ধরার কথা কিন্তু সব ব্যাপারেই তার ডাক। চল্লিশ পেরিয়ে গেছে, শরীরে একটু মেদ জমেছে কিন্তু লম্বা চেহারা বলে বোঝা যায়না। শিখা মান্ডি বয়েসে ছোট। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু কলেজে এন সি সি করে আর কারাটে মার্শাল আর্টস শিখে তার দুর্ধর্ষ বডি। সে পারোর সঙ্গে ফিল্ড ওয়ার্ক করে। ওদের 'ত্রুটি'তে, তৃতীয় আর একজন আছে, কল্যাণ রায়, ক্রয়, যে তুখোড় কম্পিউটার হ্যাকার, কিন্তু তার বেজায় ল্যাদ, বাড়ি থেকেই কাজ করে। বেরোতে চায় না।
পারো আর শিখা আজ এসেছে কাজলাগড় নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের কর্নধার প্রশান্ত ত্রিবেদীর অনুরোধে। প্রশান্তর পূর্বসূরীরা কাণ্যকুব্জের মানুষ হলেও বহু পুরুষ ধরে তারা মেদিনীপুরে আছে। রাজ্য রাজনীতি ভালোই বোঝে। ব্লক পঞ্চায়েত জেলা স্তরে সব নেতাই তার হাতের মুঠোয়। ওঁরই ভরসায়, এক প্রসিদ্ধ বাঙালি প্রযুক্তিবিদ, ডঃ অর্ক চ্যাটার্জী, তাঁর পরিকল্পিত স্মল মডিউলার রিএক্টর প্রযুক্তি ভিত্তিক একটা ছোট্ট ৬০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্ট তৈরি করবে । পূর্ব মেদিনীপুরে কাজলাগড়ে বেশ কিছুটা জমি পেয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তটভূমি প্রচুর থোরিয়াম পাওয়া যায়। ভারতীয় পরমাণু শক্তির প্রবাদ পুরুষ হোমি ভাভার স্বপ্ন ছিল এই থোরিয়াম ভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট দিয়ে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কিন্তু তিনি বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছিলেন; অনেকে বলে যে আমেরিকার সি-আই-এ তাকে খুন করিয়েছিল। অর্কর একান্ত ইচ্ছে হল ভাভার সেই স্বপ্ন পূরণ করা ।
প্রশান্তকে সঙ্গে নিয়ে অর্ক ভেবেছিল যে সে নিজে প্রযুক্তির ব্যাপারটা সামলাবে আর প্রশান্ত বাকিটা ম্যানেজ করবে। সে করছিলোও তাই। যে রাজনৈতিক দল এককালে শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে বাধা দিয়েছিল, তারাই এখন রাজা হয়ে আর মোটা পয়সা খেয়ে মোটামুটি চুপ। কাজলাগড় রাজবাড়ির পেছনে বিরাট জমি অধিগ্রহণ করে পাঁচিল দেওয়ার কাজ শুরু হওয়ার কথা । কিন্তু হঠাৎ কানু সাঁতরা বলে এক অল্পবয়েসী চাষির নেতৃত্বে তমলুক জাতীয় বাহিনী নামে একটা দল গজিয়ে উঠেছে । তারা এই পারমানবিক প্রকল্পের প্রবল বিরোধী ।
তাদের আপত্তি চিরাচরিত জমি অধিগ্রহণ নিয়ে। সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রামে ঠিক যা হয়েছিল সেই একই কথা। চাষের জমি নিয়ে চাষাকে অবলুপ্তির পথে পাঠানোর চেষ্টা আটকাতে হবে। যদিও প্রমাণ হয়ে গেছে যে চাষ করে বাংলার কৃষক আর ভালো ভাবে সংসার চালাতে পারে না, শিল্প হলে, সেখানে রোজগারের সুযোগ অনেক বেশি, তাও বাঙালির প্রতিবাদপ্রীতি সে কথা বুঝতে নারাজ। এই ব্যাপারে, লীলা গুপ্ত বলে এক অল্পবয়েসী সাংবাদিকের উৎসাহ খুবই বেশি। তার তুখোড় কলমের জ্বালাময়ী লেখায় কোলকাতার সুশীল সমাজ এই ব্যাপারে বেশ উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এবার বিরোধিতার আর একটা স্তর আছে। পারমানবিক শক্তি যে মানুষ আর পরিবেশের জন্যে ভয়ানক বিপদজনক এই কথা বলে 'সবুজ সখা' নামের এক এন-জি-ও খুব তৎপর হয়ে উঠেছে। 'সবুজ সখা'র কর্ণধার, জাফ্ফার এই মেদিনীপুরের লোক, দিল্লির জে-এন-ইউ এর সমাজবিদ্যায় স্নাতকোত্তর । গ্রিনপিস, পেটার মত আন্তর্জাতিয় সংস্থায় কিছুদিন যুক্ত থেকে এখন নিজের জেলায় ফিরে এসেছে। সে আর তার গুণমুগ্ধ অনুগামীরা বোঝে না, বা বুঝতে চায় না, যে পারমাণবিক শক্তি এখন খুবই নিরাপদ। চের্নোবিল, ফুকুশিমা মিলে কুড়ি বছরে যত লোক মারা গেছে তার থেকে ঢের বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে কয়লা বা গ্যাস ফায়ার্ড বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণে। পারমানবিক শক্তির বিরোধিতা করে জার্মানির বেশির ভাগ পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ করে দিয়ে এখন তাদের মাথায় হাত। তাছাড়া এখনকার গলিত লবন ভিত্তিক ছোট মডিউলার রিএক্টর এ পুরোনো দিনের মতন কোর মেল্ট ডাউন অসম্ভব। কিন্তু বিজ্ঞানের ছাত্র না হলে এসব বোঝা বা বোঝানো খুবই শক্ত।
পাঁচিল দেওয়ার কাজ ঘিরে কোম্পানির সিকিউরিটি স্টাফের সঙ্গে কানুর সামন্তর লোকেদের বেশ কয়েকটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। পথ অবরোধ, ইঁট ছোড়াছুড়ি, ধাক্কা ধাক্কি, বোমাবাজি এমনকি গুলিও চলেছে। পুলিশ নিরুত্তাপ দেখে প্রশান্ত তিওয়ারি পারোদের কোম্পানি, জেমিনিকে, নিয়োগ করেছে। তাদের মতে এটা শুধু চাষের জমি বাঁচানোর ব্যাপার নয় । কে বা কারা এই সব করাচ্ছে সেটা বোঝা দরকার।
"চল একটু চা খেয়ে নি।"
নিমকি দিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে চায়ের দোকানের মালিকের সঙ্গে পারো গল্প শুরু করলো।
"আচ্ছা দাদা এই কাজলাগড়ে তো খুব ঝামেলা শুরু হয়েছে।"
"আপনারা কি খবরের কাগজ থেকে আসছেন?"
"হ্যাঁ ওইরকম । এখানেও কি সিঙ্গুরের মত গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠছে?"
"প্রতিরোধ কিছুটা আছে, কিন্তু এখানে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম।"
"কি রকম?"
"টাকা পেলে লোকে জমি ছেড়ে দেবে। সিঙ্গুরের ভুল এখানে কেউ করবে না।"
"তাহলে এত ঝামেলা হচ্ছে কেন? কোম্পানি তো টাকা দিতে প্রস্তুত।"
"ওই যে কি সব জল হাওয়া দূষণের কথা জাফ্ফার বলছে।"
হাইওয়ে ছেড়ে ওরা এগরার রাস্তা ধরে কাজলাগড়ের দিকে কিছুটা এগুতেই দেখলো রাস্তায় একটা বড় জটলা, গাড়ির জ্যাম হয়ে গেছে। দুএকটা পুলিশের লোক এদিক ওদিকে থাকলেও কারোর কিছু করার উদ্যোগ নেই। শিখাকে গাড়িতে রেখে পারো নেবে এগিয়ে গিয়ে দেখলো যে রাস্তায় একটা বিক্ষোভ চলছে। রাস্তার ধারে একটা ধর্ণা মঞ্চ। তাতে একজন বলিষ্ঠ কিন্তু সপ্রতিভ অল্পবয়েসী লোক বেশ কিছু সাধারণ লোককে নিয়ে -- পুরুষ আর মহিলা দুই আছে -- বসে আছে। সঙ্গে একজন শহুরে মহিলা, চোখে কালো চশমা, কাঁধে ব্যাগ। তাকে ঘিরে কোন টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার বাইট নিচ্ছে, ছবি তুলছে। এর ছবি পারো দেখেছে, এই হল লীলা । স্মার্ট, বছর তিরিশের মহিলা, ছোট বয়কাট চুল, জিন্স আর লুস টি-শার্ট পরা, পায় বাটার পাওয়ার স্নিকার। চেহারাটা পুরুষ মানুষ ঘুরে দেখবে, কারুর কারুর চিত্ত চাঞ্চল্য হতে পারে। বাইট নেওয়া শেষ হলে, লীলা ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে এক ঢোকে খেয়ে নিল, তারপর ফোন বার করে কাউকে ফোন করলো। একটু খালি হতে, পারো এগিয়ে গিয়ে লীলা কে ধরলো।
"ম্যাডাম, একটু কথা ছিল।"
"আপনি কে?"
"মন্দিরা দত্ত।" পারো নিজের পরিচয়টা চেপে গেল। "গ্লোবাল সাউথ সংস্থা থেকে এসেছি ।"
"নাম শুনি নি তো" শুনবে আর কি করে? গতকাল ক্রয় এই গ্লোবাল সাউথ বলে একটা কাল্পনিক সংস্থার ওয়েব সাইট খুলে, চ্যাট-জিপিটি দিয়ে প্রায় খান চল্লিশেক বিবিধ বিষয়ক প্রবন্ধ তৈরি করে ভরে দিয়েছে। তার ওপর কোনো বিদেশী সেমিনারে ভাষণরত অচেনা ভারতীয় মহিলার ভিডিওতে পারোর মুখের অবয়ব লাগিয়ে একটা ডিপ ফেক ভিডিও তৈরী করে আপলোড করেছে। দেখে মনে হচ্ছে পারো, মানে মন্দিরা কথা বলছে। গুরুতর তথ্য নিয়ে।
"আমরা এই রকম প্রান্তিক মানুষের ব্যাপারে খোঁজ খবর রাখি, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিই। পাবলিক ওপিনিয়ন সেন্স আর বিল্ড করি।"
"কার্ড আছে?"
"নিশ্চয়।" বলে ব্যাগ থেকে একটা কার্ড বার করে দিল। এই ভুয়ো কার্ডটা গতকালই ভিস্টা প্রিন্ট থেকে এসেছে। "তবে আমার লিংকড-ইন প্রোফাইলে কানেক্ট করে নেবেন। " একটা পুরোনো প্রোফাইলে নাম পাল্টে পারো এখন একেবারে জেনুইন মন্দিরা হয়ে গেছে। "তাহলেই আমার ব্যাপারে সব জেনে যাবেন।"
"বলুন কি জানতে চান?"
"আপনাদের এই আন্দোলন কি শুধু চাষের জমি বাঁচানোর জন্য? নাকি আর কিছু ইস্যু আছে।"
"প্রথমেই বলি, এটা আমার বা আমাদের আন্দোলন নয়। কানু সাঁতরা ও তার সহযোগীরা ওদের নিজেদের এই সরল গ্রামীণ জীবনধারা বাঁচিয়ে রাখার জন্যে এই আন্দোলন করছে।"
"কিন্তু এখন তো শোনা যায় যে সিঙ্গুরের মানুষ আঙ্গুল কামড়াচ্ছে? কারখানা হলে মানুষ চাকরি পেত ।"
"এটা টাটা কোম্পানির মিথ্যাচার। তা ছাড়া এখানে আরো বড়ো বিপদ পারমাণবিক দূষণ। হিরোশিমা নাগাসাকি থেকে কি আমরা এখনো কিছুই শিখিনি?"
"আমি এদের কোম্পানির একটা ব্রোশার দেখছিলাম। সবটা বুঝি না," পারো একটু বোকা বোকা ভাব করলো, "তাতে যা বলে সেটা পড়ে তো মনে হয় যে এদের প্রযুক্তি খুব সেফ।"
"সব বাজে কথা। পারমানবিক শক্তি কখনোই নিরাপদ হতে পারে না।"
"একটু বুঝিয়ে বলবেন? সেই ভাবে লিখবো তাহলে।"
"তাহলে আপনাকে জাফ্ফার এর সঙ্গে কথা বলতে হবে। ও এসব খুব ভালো বোঝে।"
"উনি কি এখানে আছেন? একটু দেখা করা যাবে?"
"ও তো আজ কোলকাতায় গেছে, সন্ধ্যা বেলা ফিরবে। সাতটার পরে আসতে পারবেন?"
হাতে কিছুটা সময় পেয়ে পারো আর শিখা কাজলাগড়ের রাজবাড়ি ঘুরে দেখতে গেল। কোম্পানির অধিকৃত জমির লাগোয়া বিরাট এলাকা জুড়ে রাজবাড়ির ভগ্নাবশেষ। সামনের দিকের বেশ কিছুটা ফাঁকা জমি নিয়ে সরকারি অফিস হয়েছে । তার পেছনে, বট অশথ্ব গাছের ঘন জঙ্গলে ঘেরা তিন চারটে বড় বড় পুকুর। এরই মধ্যে একটা হল বিখ্যাত কাজলা বিল। তারই পাশে চার মহলা বিরাট রাজবাড়ির জরাজীর্ন কঙ্কাল। দোতলার ঘরগুলোর ছাদ বহুদিন আগেই পড়ে গেছে। একতলার ঘরগুলোর ভেতর দুএকটা সরকারি অফিসের গুদামের কাজ করে । খুব দরকার না পড়লে এদিকটায় বড় একটা কেউ আসে না। রাত্রে এলে নির্ঘাত গা ছমছম করবে।
"এই জঙ্গলে ঢুকবে দিদি? সাপে কামড়াবে না তো!"
"রাস্তায় ফিরে গিয়ে কি করবি? চল না ভেতরে কি আছে দেখি।"
"রাতে এখানে বাঘ ও বেরোতে পারে!"
রাজবাড়ির একেবারে পেছন দিকে, কাজলা বিলের গায়ে একটা বহু পুরোনো মন্দির। সেটাকে বট গাছের শেকড় আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। "লোকে কম্বোডিয়ার সিয়াম রিয়েপ যায় তা-প্রম এর ব্রহ্মা মন্দির দেখতে আর আমরা সেই মন্দিরই দেখছি মেদিনীপুরে!"
মন্দিরের পেছন দিকে একটা ছোট ঘর। হয়তো কোন কালে পুরোহিত থাকতো । এখন খালি কিন্তু কিছুটা পরিষ্কার। যেন মাঝে মাঝে কেউ আসে। ঘরের কোন দুটো খালি মদের বোতল। "আড়ালে ফুর্তি করার বেঁড়ে জায়গা"।
গর্ভগৃহে এককালে কোন মূর্তি ছিল, এখন অরে নেই। ফাঁকা বেদিটা পড়ে আছে। হয়তো কালা পাহাড় এসে ভেঙে দিয়েছিল, আরো অজস্র বাংলার মন্দিরের মত। দেওয়ালে কিন্তু বেশ কিছুটা টেরাকোটার কাজ এখনো রয়ে গেছে, সেগুলো ভাঙেনি। তারই মধ্যে একটা বেশ সুন্দর কালী মূর্তির বাস রিলিফ, মোটামুটি অক্ষুন্ন।
"যাক, এইটাকে আর ভাঙার সময় হয়নি।"
"মূর্তিটা দেখেছিস? শিবের ওপর ন্যাংটো কালী। একে বলে বিপরীত রতাতুরঙ্গ । ওম্যান অন টপ!"
"এখানে কি তান্ত্রিকের পুজো হত ?"
"হতেও পারে, কিন্তু এনাকে এখনো কেউ মনেও রেখেছে!" মূর্তির সামনে মাটিতে রাখা রয়েছে একটা বেশ ভারী একটা মাটির থালা, বা সরা। তার ওপর কিছু শুকনো জবা ফুল পড়ে আছে। পুজো না হলেও কেউ এখনো ফুল দিয়ে যায়।
জাফ্ফারের সঙ্গে সাতটার আগে দেখা হবে না। পারো আর শিখা ছোট একটা হোটেলে বেশ বড় করে লাঞ্চ করলো। সময় কাটাতে হবে।কানুর সঙ্গে দেখা করলে ভালোই হত কিন্তু সে গুড়ে বালি। ধর্ণা মঞ্চে বেশ কিছু লোকাল নেতারা এসেছে, আসবে। ও তাদের নিয়েই ব্যস্ত। দূর থেকে দেখলো, বেশ ষণ্ডাগুণ্ডা লোক । রাস্তা অবরোধ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কি সব তর্ক বিতর্ক চলছে। পারোর কাছে এগরা থানার ওসি আর পূর্ব মেদিনীপুরের এসপির নম্বর ছিল, কিন্তু আজ সে তাদের সঙ্গে কোনোরকম পরিচিতির ইঙ্গিত দেখালো না। হোটেলের মালিক অবশ্য বখতিয়ার খিলজি। খুবই বকবক করে।
"আচ্ছা আপনারা কোন চ্যানেল থেকে এসেছেন?"
"আমাদের একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে।" এখানে গ্লোবাল সাউথ পোর্টাল বোঝানো খুবই শক্ত।
"মানে ওই সন্ময় বাবুর মত?"
"ওই আর কি, ওনার অবশ্য অনেক ফলোয়ার বেশি। আমরা খুবই ছোট।" বলে পারো ক্রয়ের করা ওয়েবসাইটটা খুলে ওর ডিপ ফেক ভিডিওতে ওর বক্তৃতা শুনিয়ে দিল।
"বাঃ আপনি ভালোই বলেন।"
"আচ্ছা কানু বাবুকে আপনি চেনেন?"
"বাবু আবার কি? ওতো কালকের ছোকরা । তবে বেশ চৌকশ, করিৎকর্মা ছেলে, নিজের ব্যাপারটা খুব ভাল বোঝে। কায়দা করে নিজের পাওনা কড়ায় গন্ডায় বুঝে ন্যায় ।
"কি রকম?"
"এই যেমন ৫ লাখ টাকা নিয়ে গোবর্ধনের হিড়িম্বার মত মেয়েটাকে বিয়ে করলো।"
"হিড়িম্বা?"
"ওই আর কি, কালো মোটা মেয়ে, বিয়ে হচ্ছিল না।"
"যাই হোক, বিয়ে তো করেছে? পাড়াগাঁয়ে মেয়ে পড়ে থাকলে তো আপনারাই আবার কথা শোনাবেন।"
"করেছে মানে নামেই করেছে। মেয়ে তো বাপের বাড়িতেই পড়ে থাকে। একটা বাচ্চা হয়েছে, সেও মামার বাড়িতেই।"
"আহা বেচারি মেয়েটা।"
"এদিকে কানু আবার সুখেনের ডবকা বৌয়ের পোঁদে পোঁদে ঘুরঘুর করে। শুনেছি তাকে নিয়ে নিজের ডেরাতেও নিয়ে যায়।"
"ডেরা কোথায়?"
"ঠিক জানিনা, তবে শুনেছি ওই বেলদার দিকে।"
"সুখেন কিছু বলে না?"
"কানু যা মনে করে সেটা করেই ছাড়বে । দেখছেন না কেমন কোম্পানিকে ঘোল খাওয়াচ্ছে।"
"তাই বলে পরের বউকেও?"
"একে ষাঁড়ের মত গায়ের জোর, তার ওপর পার্টির হাত আছে ওর মাথায়। রেগে গেলে কি না কি করে দেবে। সুখেন ভোলা ভালা লোক, পরিযায়ী শ্রমিক, বাইরে বাইরেই থাকে। যদিও বা আসে, মাথা নিচু করেই থাকে।"
সন্ধ্যে সাতটার একটু পরে পারো আর শিখা জাফ্ফারের বাড়িতে হাজির হল। প্রাসাদোপম না হলেও মেদিনীপুরের গ্রামের মধ্যে এরকম বাড়ি পার্টির লোকেদের ছাড়া হয় না। দোতালা বাড়ি, একতলায় সবুজ সখার অফিস আর নিজের পার্সোনাল বসার ঘর, খাওয়ার ঘর। ওপরে প্রাইভেট শোয়ার জায়গা। গ্যারেজে বড় টয়োটা ইনোভা গাড়ি। গাড়ির কাঁচে কালো ফিল্ম। এক মহিলা পরিচারিকাকে নিজেদের পরিচয় দিলে সে ওপর থেকে ঘুরে এসে বলল ওদের একটু বসতে হবে। বাবু ফোনে কথা বলছেন।
"হ্যাঁ গো, বাবুর বউ ছেলে নেই?"
"ছেলেতো কোলকাতায় পড়ে আর বৌদি ওকে নিয়েই কলকাতার বাড়িতেই থাকে।"
আর তুমিই বুঝি দেখ ভাল করো?"
"আমি আর আমিনা আছি। আমরাই চালিয়ে দিই ।"
"বাবু যান না?"
"বাবু খুব ব্যস্ত, প্রচুর কাজ। সারাদিনই ফোন করছেন।"
"আর এখন তো এই কাজলাগড়ের নতুন প্রকল্প নিয়ে নতুন ঝামেলা।"
"হ্যাঁ এই তো কদিন আগেই বিদেশ থেকে এক সায়েব আর মেমসায়েব এসেছিল। সারা রাত ধরে প্রচুর কথা বার্তা হল। ফোন হল ।"
"তাই বুঝি?"
"ওই দেখুন, লীলা দিও চলে এসেছেন।"
একটা কালো বোলেরো গাড়ি থেকে লীলা নেমে ড্রাইভার কে ছেড়ে দিল । "মাসুদ ভাই, আজ আর গাড়ি লাগবে না।" তার পর পরিচারিকাকে জিজ্ঞেস করলো। "জাফ্ফার সাহেব ফিরেছে?"
"হ্যাঁ দিদি, কিছুক্ষন আগেই ফিরেছে। ওপরে ফোন করছে, এনাদের বসতে বলেছে।"
"মন্দিরা না? আজ সকালেই দেখা হল," লীলা ওদের দিকে হাসলো। "আপনারা বসুন, আমি চেঞ্জ করে আসছি। রুবি, তুমি এদের একটু চা করে দাও," বলে ভেতরে চলে গেল।
"ম্যাডাম কি এখানেই থাকেন?"
"উনি তো কোলকাতা থেকে আসা যাওয়া করেন, কিন্তু হ্যাঁ, রাতে থাকার হলে আমাদের বাড়িতেই থাকেন। আমি যাই চা করে আনি ।" বলে রুবি বেরিয়ে গেল।
পারো চেয়ে চেয়ে ঘরের সব কিছু দেখছিল। তারপর শিখার দিকে ফিরে চোখ তুলে হাসলো । "কি বুঝছিস?"
"বৌ কোলকাতায় থাকে। দুটো মেয়েছেলে কাজের লোক। তারপর কোলকাতার লীলা গুপ্ত ও এখানে বেশ পাকাপাকি ভাবে থাকে।" কিন্তু আর কিছু বলার আগেই গৃহকর্তার আগমন হল।
জাফ্ফার এর চেহারায় কিছুটা কাত্তিক কাত্তিক ভাব আছে। দেহে ছিঁটে ফোঁটা যবনের রক্ত আছে বলে নিজেকে সলমান খান মনে করলেও বড় জোর তাকে আমির খান অবধি ভাবা যেতে পারে! চোখে গান্ধী মার্কা গোল গোল রিমলেস চশমা পরে মুখে একটা জে-এন-ইউ ফেরত বুদ্ধিজীবীর ছাপ পড়ে গেছে। কথা একটু আস্তে আস্তে বলে, ভেবে ভেবে, চিবিয়ে চিবিয়ে। লোকের মনে ইম্প্যাক্ট ফেলার জন্য।
"এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি মেদিনীপুরের পরিবেশটাকে একেবারে ধ্বংস করে দেবে।" পরিচয় বিনিময়ের পরেই জাফ্ফার নিজের লাইনে চলে এল।
"কিন্তু অর্ক বাবু যে বলছেন যে ওনাদের প্রযুক্তি খুবই সেফ।"
"সেটা ওনার মত, কিন্তু উনি কতটুকুই বা জানেন?" জাফ্ফার হাসঁলো । "বিদেশে এসব নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে, যার খবর ওনারো নেই আর আপনাদের তো আরোই নেই। আমার সঙ্গে নানা বিদেশী সংস্থার নিবিড় যোগ আছে। আমরা পড়াশুনো করি, শিখি, লোককে শেখানোর চেষ্টা করি। এইটা আমাদের এই 'সবুজ সখা' দলটির লক্ষ্য।"
"সত্যিই তো, আমরা আর কতটুকু জানি। কিন্তু শুনছি যে কিছু লোক টাকা পেলে জমি ছেড়ে দেবে বলছে। "
"এই জন্যেই তো আমাদের সাস্টেনেবল লাইভলিহুডের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। এই তো এক্ষুনি এক জার্মান সংস্থার সঙ্গে কথা বলছিলাম। ওরা এখানে একটা অর্গানিক ফার্মিংএর পাইলট করার জন্য টাকা পাঠাতে চায়। আমায় বলছে কোন ভাল চাষির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। মাইক্রো ফিনান্স লোন দেবে ।"
"ইউরোপ তো নিজেই টলোমলো । তারা টাকা পাঠাতে চায়?"
"একেই বলে অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী। আপনারা কতটুকু জানেন ইউরোপ সম্মন্ধে? এই তো আমি একটা প্যারিসে কনফারেন্স এ গেছিলাম। ওদের কাছে কত কি শেখার আছে। আপনারা খালি রামায়ণ মহাভারতের গল্প শুনেই সব পণ্ডিত হয়ে গেছেন।"
এত সব কথার মাঝে লীলা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এস জাফ্ফারের পাশে বসলো। লীলাকে দেখে পারোর একটু খটকা লাগলো। জিন্স টি-শার্ট ছেড়ে সালোয়ার। আবার সালোয়ারের ওড়নাটা দিয়ে মাথা ঢাকা আর কানের পাশে আটকানো। সাধারণত মুসলিম মেয়েরাই এই রকম করে ঘোমটা দেয়। তা ছাড়া জাফ্ফার যে ভাবে ওর হাতের ওপর হাত রাখলো, যেন নিজের সম্পত্তি!
"আচ্ছা আজ তোমাদের পথ অবরোধ বেশ অনেক্ষন ধরে হলো দেখলাম।" জাফ্ফার লীলাকে বললো।
"হ্যাঁ প্রায় তিন ঘন্টা রাস্তা বন্ধ ছিল। তারপর পুলিশ এসে অনুরোধ করতে আমার সরে গেলাম।"
"আচ্ছা আপনি তো ছিলেন না ওখানে?" পারো মনে প্রশ্ন জেগেছে। "আপনি কি করে জানলেন লীলা তিন ঘন্টা পথ অবরোধ করেছিল।"
"এর জন্যে একটু টেকনোলজি বুঝতে হয়। লীলা আমার সঙ্গে ওর লোকেশন শেয়ার করে রাখে। এখানে আমি ওর গার্জেনের মত। কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, সব সময়ে নজর রাখি।"
"আমি আবার এসব টেকনোলজি কিছুই বুঝি না। জাফ্ফার আমায় শেখায়।"
"আচ্ছা আপনারা তো অনেক কিছু জানেন, তা আমাদের ওয়েবসাইটে কিছু লিখুন না। এই বিষয়ে সকলেই ধোঁয়াশায় আছে। পরিষ্কার হয়ে যাবে।"
"এ তো ভালো কথা," জাফ্ফার মেনে নিল, "কিন্তু আমার তো একেবারেই সময় নেই। হাতে প্রচুর কাজ।" সময় নেই, না লেখার ক্ষমতা নেই, পারো মনে মনে ভাবলো, কিছু বলল না ।"আচ্ছা লীলা কে বলে দেব কি লিখতে হবে, ও সময় করে লিখে দেবে।"
"সে তো খুবই ভালো কথা। দেখবেন ম্যাডাম আমাদের ওয়েবসাইট থেকে একটা আপ ডাউনলোড করে নেবেন। ওই আপের ভেতর দিয়ে আপনার লেখা জমা দিলে, আর সেটা আমাদের সম্পাদক গ্রহণ করলে সঙ্গে সঙ্গে আপনার ইউ-পি-আই একাউন্টে এক হাজার টাকা জমা পড়ে যাবে।"
"এত খুবই কম! আমরা যে সব বিদেশী এন-জি-ও দের সঙ্গে কাজ করি তারা তো একশো ডলার দেয় ।"
"গ্লোবাল সাউথ বহু পুরোনো সংস্থা। চট করে কাউকে লিখতে দেয় না। লীলার দু একটা লেখা প্রকাশিত হলে, আমাদের গ্লোবাল ডিরেক্টর নিজে থেকেই এমাউন্ট টা বাড়িয়ে দেবে।"
ক্রয়ের এই অ্যাপ একবার ফোনে ইনস্টল করলে লোকেশন সহ ফোনের সব খবর পারোর হাতে!
--------------------------------------------------
মাস খানেক সব চুপচাপ। লীলা একটা প্রবন্ধ জমা দিয়েছে, টাকা পেয়েছে। মিছিল অবরোধ আন্দোলন লেগেই আছে আর তার ভেতরেই প্রকল্পের কাজ মন্থর গতিতে চলছে। হঠাৎ একদিন ভোর সকালে প্রশান্ত ত্রিবেদীর ফোন।
"পারো, কাল একটা কান্ড ঘটে গেছে।"
"কি হল?"
"গত রাতে জাফ্ফারের খুন হয়েছে আর ওর বডি পাওয়া গেছে আমাদের কারখানার দেওয়ালের গায়ে। এখন সকলে বলছে যে আমরাই ওকে খুন করিয়েছি। এলাকা উত্তাল। তুমি একটু যেতে পারবে? কি হয়েছে ঠিক ঠাক জানা দরকার।"
শিখাকে নিয়ে, পারো কিছুক্ষনের মধ্যেই স্পটে পৌঁছে গেল। বিরাট ভিড়, প্রচুর লোক, স্লোগান । পারো আর শিখার গাড়িতে প্রেস লেখা থাকার জন্য তারা কিছুটা এগোতে পারলো কিন্তু অবশেষে পুলিশের বেড়ায় আটকে গেল। বাকিটা পায়ে হেঁটে গিয়ে দেখলো যে বডি মর্গে চলে গেছে। যেখানে বডি পাওয়া গেছে সেইখানটা ঘেরা, তিন চারটে পুলিশ কনস্টেবল গোছের লোক পাহারা দিচ্ছে। কোম্পানির তরফ থেকে এগরা থানার ওসিকে বলা ছিল যে একজন বিশেষ গোয়েন্দা পাঠানো হচ্ছে, তাই তিনি পারোর ফোনটা ধরলেন।
"নমস্কার, পারোলিকা বলছি। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে।"
"খুবই ব্যস্ত আছি ম্যাডাম, বুঝতেই তো পারছেন অবস্থাটা খুবই সেনসিটিভ।"
"আমার কাছে কিছু খবর আছে। আপনাদের সুবিধা হবে।"
"বলুন, বলুন।"
"সামনাসামনি বলতে হবে। আপনি কি এদিকে আসছেন?"
"মর্গের পোস্ট মর্টেম টা চালু করে দিয়ে আসছি। ঘন্টা খানেক লাগবে।"
"একটা খুব টাইম সেনসিটিভ ব্যাপার। তথ্য লোপাট হবার সম্ভবনা আছে। তাই একটু তাড়া ছিল।"
আধ ঘন্টার মধ্যেই ওসি হাজির। "বাজে দৌড় করাচ্ছেন না তো?"
"দেখুন, আপনাকে একটা জিনিস দেখাই । বডি পাওয়া গেছে এই দেওয়ালের পাশে, তাই না?" পারো ফোনে গুগুল ম্যাপ খুললো।
"হ্যাঁ , সে তো জানি। মাথা ফাটা চৌচির। মেরে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তারপর আবার জেনিটাল মিউটিলেশন। পুরুষাঙ্গতে আঘাত।"
"মার্ডার ওয়েপন পেয়েছেন?"
"না। অনেক খোঁজা হয়েছে। কিচ্ছু নেই।"
"আচ্ছা এখানে কাছেই একটা পুরোনো কালী মন্দির আছে, সেখানে যাবেন?"
ছোট্ট পুলিশ বাহিনী নিয়ে শিখা আর পারো সেই পুরোনো মন্দিরটায় গেল। ভেতরটা খালি ।
"এখানে তো কিছুই নেই?"
"একটু দেখুন। এটা কি?"
"ভাঙা থালার টুকরো। এটার সঙ্গে কি যোগ আছে?"
"স্যার, টুকরোটায় মনে হচ্ছে রক্তের দাগ।" একজন কনস্টেবল দেখালো।
"থালা দিয়ে মাথায় মারলে কি মারাত্মক আঘাত হতে পারে ?"
"তা তো হতে পারে। তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলে বাকিটা। কিন্তু " ও সি একটু ধন্দে পড়লেন।
"আমরা লীলা গুপ্তর ফোনে একটা আপ ইন্স্টল্ করেছিলাম । তাইতে দেখলাম উনি কাল রাতে এখানে এসে ছিলেন, তারপর উনি গেছেন কানুর বাড়িতে । কানুর বাড়ির আসে পাসে খোঁজ করলে এই থালা, মানে মার্ডার ওয়েপনের -- বাকি অংশ পাওয়া যেতে পারে।"
"এখানে যে থালাটা ছিল তার কি প্রমাণ? ভাঙা টুকরোটা এমনিও থাকতে পারে।"
"এই দেখুন, আমার কাছে এই মন্দিরের একটা ছবি আছে, কিছুদিন আগে তোলা, সেখানে থালাটা দেখা যাচ্ছে।"
"ওরেঃ বাবা এতো সাংঘাতিক খবর । এবার বাকিটা পেলেই আমাদের কাজ অনেকটাই এগিয়ে যাবে।"
"আমি আপনাকে এই ম্যাপে দেখাচ্ছি আপনারা এই কানুর বাড়ির পেছনে গিয়ে খোঁজ করুন।"
"ঠিক আছে, আপনাকে আর আসতে হবে না, বাকিটা আমি বুঝে নেব।" ওসি ভাবছে যে এত তাড়াতাড়ি কেসের সমাধান করার ক্রেডিটটা একা পেলেই ভাল।
--------------------------------------------------
পরের দিন সন্ধ্যে বেলায় প্রশান্তের ফোন।
"পারো তুমি তো ফাটিয়ে দিয়েছো!"
"লীলা এরেস্ট হল?"
"না, খুন করেছে কানু। জাফ্ফারের সঙ্গে লীলাকে নিয়ে ওর একটা ত্রিকোণ সম্পর্ক ছিল। ওর সঙ্গে লীলার কয়েকটা ন্যুড ফটো জাফ্ফারের ফোনে পাওয়া গেছে।"
"তাই থেকে খুন করে দিল!"
"দুজনেই লীলার পিছু নিয়েছিল, আর সেই থেকেই এই ভয়ানক মার্ডার।"
"লীলার ফোন থেকে আমরা ট্র্যাক করলাম, লীলা মার্ডার স্পটে ছিল। ও তো কালপ্রিট । ওকে ছাড় কেন?"
"না। লীলা মার্ডারের আগের দিন থেকে কোলকাতার একটা হোটেলে একটা সেমিনার এটেন্ড করছে। অনেক রাত অবধি ও একটা পার্টিতে ছিল। পরের দিন জিমে ওয়ার্কআউট করেছে। অনেকে দেখেছে, কথা বলেছে, যথেষ্ট পাকা আলিবাই আছে।"
"আর ফোন?"
"বলছে ভুল করে ফেলে এসেছিল ধর্ণা মঞ্চে, কালুকে বলেছিল তুলে রাখতে।"
আর জাফ্ফার যেহেতু ওই ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে, ও ভেবেছিল ও কানুর লীলাভূমিতে পৌঁছে যাবে। কিন্তু কানু যে ওর অপেক্ষায় বসে আছে, সেটা আর বুঝবে কি করে? পারো স্তম্ভিত হয়ে গেল। তারপর মনে মনে বললো "হোয়াট আ বিচ।" কিন্তু ততক্ষনে ফোনের লাইন কেটে গেছে।
--------------------------------------------------
আরো ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। জাফ্ফার জন্নাতে আর কালু জেলে । বাকি সব চাষিরা, সিঙ্গুরের ফাঁদে পা না দিয়ে, ভাল দামে জমি বেচে দিয়ে সেই টাকা পোস্ট অফিস ব্যাংকে রেখে সুদ খাচ্ছে। প্রচুর কন্সট্রাকশন কাজ হচ্ছে, বেশ কিছু লোক করে খাচ্ছে। সিঙ্গুর নন্দিগ্রামের শোক কাটিয়ে উঠে রাজ্য সরগরম।
সেদিন কোম্পানির প্রধান রিএকটার ডোমের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের একটা অনুষ্ঠান ছিল। মুখ্যমন্ত্রী, প্রধান মন্ত্রী দুজনেই এসেছিলেন। পারো, শিখা আর ক্রয়ের নিমন্ত্রণ ছিল। সেখান থেকে তারা যখন বেরোচ্ছে তখন প্রশান্ত আর অর্কের সঙ্গে দেখা।
"সন্ধ্যে বেলা আমাদের সিটি অফিসে এস, একটা জিনিস দেখাবো।"
ম্যানডেভিল গার্ডেনসের একটা পুরোনো বাংলো বাড়িতে কাজলাগড় নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের রেজিস্টার্ড অফিস। সেখানের বাগানেই আজ কোম্পানির ঘরোয়া পার্টি। পদস্থ আধিকারিক আর তাদের পার্টনারদের আমন্ত্রণ। ককটেলসের গ্লাস নিয়ে কিছুক্ষন কথাবার্তার পর গ্লাসের গায়ে টুংটুং করে চামচ বাজিয়ে অর্ক সকলকে এক জায়গায় জড় করলো।
"বন্ধুগণ ! আজ আমাদের বহু আকাঙ্খিত রিএক্টর ডোমের শুভ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর আর একটা শুভ ব্যাপারের কথা আপনাদের জানাবো বলে আজ এখানে ডেকেছি। আপনারা জানেন যে এই প্লান্টটা ঘিরে একটা ঝামেলা তৈরী হয়েছিল আর সেই ঝামেলা শেষ অবধি কেটে গেছে একটা অবাঞ্ছিত মৃত্যুর ভেতর
দিয়ে। কিন্তু, যে অস্ত্রটা দিয়ে এই মৃত্যুটা ঘটানো হয়েছিল সেটা আমরা অনেক কষ্ট করে পুলিশের হাত থেকে আনতে পেরেছি।"
"এটা আনার কি কোনো প্রয়োজন ছিল?" একজন আধিকারিক জিজ্ঞাসা করলেন।
"দেখলে বুঝবেন, আসুন," বলে তিনি সবাইকে ডেকে নিয়ে গেলেন ভেতরের ঘরে, বোর্ড রুমে। দেওয়ালে, কাঁচের ভেতরে রয়েছে কিছু পোড়া মাটির ভাঙা টুকরো, গোল করে সাজানো। বোঝাই যাচ্ছে একটা টেরাকোটার ভাঙা সরা, জুড়ে এক করা হয়েছে।
"এই সেই মার্ডার ওয়েপন, কাছে গিয়ে ভালো করে দেখুন।"
"বঙ্গোপসাগরের তীরে,
বগদা-হলদির কোলে,
আঁধার পেরিয়ে জাগি,
আদিশক্তির নব দোলে।"
"ওরে বাবা, এত আমাদের লোকেশনের কথা বলছে। শক্তি জাগবে ঐখানেই।"
"হলদি বুঝলাম, বগদা নদী কোথায়?"
"আরে কালীনগরের আগে ওটাকেই বগদা বলে, তারপর রসুলপুর নদী ।"
কিন্তু পারোর নজর পড়ল কাঁচের বাক্সের থেকে একটু দূরে, আলো আঁধারিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলা।
"লীলা তুমি এখানে?"
"হ্যাঁ," পাশ থেকে উত্তর দিল অর্ক । "লীলা আমাদের পাবলিক রিলেশনসে চাকরির জন্য আবেদন করেছিল, কিন্তু কথা বলেই বুঝেছিলাম যে ওর অনেক গুণ আছে ।"
"তাই ওরই কথামত আমি ওকে কাজলাগড়ে পাঠিয়েছিলাম" প্রশান্ত বললো।
"ও জানতো যে আমরা এই অনুসন্ধান করছি?"
"নিশ্চই! আর সেই জন্যেই তো আমি ক্রয়ের ওই আপ টা আমার ফোনে নিয়ে নিই পারোদি । যাতে ও আমার লোকেশন ট্র্যাক করে তোমার কাজটা এত সহজ করে দেয়।"
পারো স্তম্ভিত। কিছুই আর বলার নেই। এমন নিপুণ ভাবে লীলা তাদের দিয়ে কোম্পানির পথের কাঁটা সরিয়ে দিল !
"কিন্তু তুমি এই কাজটা করলে কেন?"
"কেন? এই দেখো অর্ক আর প্রশান্ত আমায় কেমন সুন্দর একটা থোরিয়ানাইটের নেকলেস গড়িয়ে দিয়েছে।" লীলার গলায় একটা থোরিয়াম-ম্যাগনেসিয়াম মিশ্রধাতুর নেকলেস, তাইতে একটা বড় কালো পাথরের লকেট চকচক করছে।
"এই রত্ন তো সাংঘাতিক রেডিওএকটিভ ।"
"হা হা হা তা হতে পারে কিন্তু আমার থেকে বেশি তেজস্ক্রিয় কিছুই হয় না।"
--------------------------------------------------
সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে লীলার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।


Comments