কালের ফাটল
রহস্যের আড়ালে প্রযুক্তি, আর প্রযুক্তির আড়ালে মানুষ
গোয়েন্দা গল্প বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে খুনের জায়গায় পড়ে থাকা কোনও সূত্র, সন্দেহভাজন কয়েকজন মানুষ, আর এক তুখোড় গোয়েন্দা, যিনি শেষ পর্যন্ত সব রহস্যের জট খুলে দেন।
কিন্তু অপরাধের দুনিয়াটা এখন অনেক বদলে গেছে। খুন করতে সবসময় বন্দুক লাগে না, কাউকে ফাঁসাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকারও দরকার পড়ে না। একটা স্মার্টফোন, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, কিংবা কোনও নিরীহ দেখতে ইলেকট্রনিক যন্ত্রও হয়ে উঠতে পারে অপরাধের হাতিয়ার।
এই বদলে যাওয়া পৃথিবীকে নিয়েই পাঁচটি রহস্যকাহিনির সংকলন ‘কালের ফাটল’।
আর এই পাঁচ গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে তিনজন একেবারেই অন্যরকম তদন্তকারী।
পারলিকা মুখার্জি, ওরফে পারো। চল্লিশ পেরোনো, স্বাধীনচেতা, বুদ্ধিমতী এক কলকাতার মহিলা। পেশায় ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট। হিসেবের গরমিল ধরতে গিয়ে মানুষের মনের গরমিলও বেশ ভালোই বুঝে ফেলেন। জীবনের নানা ঝড়ঝাপটা সামলে নিজের মতো করে বাঁচতে শিখেছেন। ভালো খাবার, ভালো পানীয়, আড্ডা—কোনও কিছুতেই তাঁর আপত্তি নেই। তবে কোনও রহস্য মাথায় ঢুকে গেলে তার শেষ না দেখে ছাড়েন না।
শিখা মাণ্ডি। বয়সে ছোট, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু প্রয়োজনে মার্শাল আর্টসের কায়দায় বিপদ সামলাতে এক মুহূর্তও দেরি করেন না। পারোর সঙ্গে মাঠেঘাটে ঘুরে তদন্ত করার দায়িত্বটা মূলত তাঁরই। যেখানে পারোর অস্ত্র বুদ্ধি, সেখানে শিখার বুদ্ধির সঙ্গে রয়েছে দুর্দান্ত সাহস আর উপস্থিত বুদ্ধি।
আর তৃতীয়জন কল্যাণ রায়, ওরফে ক্রয়। অসাধারণ প্রতিভাবান এক হ্যাকার। ঘর থেকে বেরোনোর ব্যাপারে প্রবল অনীহা, কিন্তু কম্পিউটারের সামনে বসে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারেন। অন্য দুজন যখন বাস্তব জগতের সূত্র খুঁজছেন, ক্রয় তখন ডিজিটাল দুনিয়ায় খুঁজে চলেছেন অদৃশ্য পায়ের ছাপ।
এই তিনজনের রসায়নটাই বইটির অন্যতম আকর্ষণ। এঁরা কেউ সর্বজ্ঞ নন, ভুল করেন, বিপদে পড়েন, নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করেন। আর তার মধ্যেই এগিয়ে চলে একের পর এক রহস্য।
পাঁচটি গল্প, পাঁচ রকম বিপদ
কলকাতার স্নাইপার
কলকাতার বন্দর এলাকার এক প্রভাবশালী মহিলাকে দিনের আলোয়, নিজের বাড়ির জানলার সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুলি এসেছে বহু দূর থেকে। খুনের পেছনে কি এলাকার অপরাধজগতের পুরোনো শত্রুতা? নাকি এমন কোনও ইতিহাস রয়েছে, যার শিকড় ছড়িয়ে আছে কলকাতার বহু বাইরে, বহু বছর আগে? আধুনিক প্রযুক্তির সূত্র ধরে তদন্ত এগোতে থাকে এক অপ্রত্যাশিত অতীতের দিকে।
থোরিয়ামের নেকলেস
পশ্চিমবঙ্গের উপকূল, বিরল খনিজ সম্পদ, বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক রহস্যময় মৃত্যু। একটি মোবাইল অ্যাপের সাহায্যে তদন্তে বড় সাফল্য আসে। কিন্তু প্রযুক্তি যে তথ্য দেখাচ্ছে, সেটাই কি সম্পূর্ণ সত্যি? নাকি কেউ খুব যত্ন করে তদন্তকারীদের ঠিক সেই পথেই নিয়ে যাচ্ছে, যে পথে তাদের যাওয়া দরকার? আর গল্পের নামের ওই নেকলেসটির রহস্যই বা কী?
হারানো রুবি
এক দুর্নীতিগ্রস্ত চিকিৎসকের অস্বাভাবিক মৃত্যু থেকে বেরিয়ে আসে মূল্যবান রত্ন, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র আর গোপন অর্থ লেনদেনের এক জটিল জাল। তদন্ত যত এগোয়, ততই বোঝা যায় যে দৃশ্যমান অপরাধের আড়ালে রয়েছে আরও অনেক স্তর। কিন্তু সমস্ত হিসেব মিলে যাওয়ার পরেও কয়েকটি অমূল্য রুবির কোনও হদিস পাওয়া যায় না। সেগুলো গেল কোথায়?
স্বকণ্ঠে পাশঃ
বহু বছর আগের এক নৃশংস অপরাধ। প্রভাবশালীদের চাপে চাপা পড়ে যাওয়া বিচার। তারপর হঠাৎ এক অভিযুক্ত ব্যক্তির রহস্যজনক আত্মহত্যা। মৃত্যুর আগে তিনি নাকি এমন কিছু অনুভব করছিলেন, যার কোনও স্বাভাবিক ব্যাখ্যা নেই। সত্যিই কি অতীতের কোনও অশরীরী শক্তি ফিরে এসেছে প্রতিশোধ নিতে? নাকি আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে এমন ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব, যেখানে মানুষ নিজের চোখ-কানকেও আর বিশ্বাস করতে পারে না?
কালের ফাটল
শেষ কাহিনিটি নিয়ে বেশি কিছু বলাই মুশকিল। কলকাতা থেকে তিব্বত, সাইবার রহস্য থেকে স্নায়ুবিজ্ঞান, হিমালয়ের বৌদ্ধ মঠ থেকে সময়ের অদ্ভুত সব অসংগতি—সব মিলিয়ে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। যদি আপনার জীবনের একটা গোটা দিনের স্মৃতি থাকে, অথচ ঘড়ি আর ক্যালেন্ডার বলে সেই দিনটা আদৌ কাটেনি, তাহলে কাকে বিশ্বাস করবেন? নিজের স্মৃতিকে, না বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাকে? আর যদি সেই ব্যাখ্যাতেও সব প্রশ্নের উত্তর না মেলে?
আসল রহস্যটা শুধু ‘কে খুন করল’ নয়
এই বইয়ের পাঁচটি গল্পের মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল রয়েছে।
প্রযুক্তি এখানে সবসময় গোয়েন্দার সহায়ক নয়। কখনও প্রযুক্তিই অপরাধের অস্ত্র, কখনও তা দিয়ে তৈরি হয় নিখুঁত প্রতারণা, কখনও প্রযুক্তি অপরাধীকে ধরিয়ে দেয়, আবার কখনও প্রযুক্তির সাহায্যে পাওয়া ব্যাখ্যাটাই শেষ পর্যন্ত নতুন প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আর একটা বিষয় বারবার ফিরে আসে - সত্যি জানা আর ন্যায়বিচার পাওয়া কি একই ব্যাপার?
পারো হয়তো বুঝে ফেলেন কী ঘটেছে। কিন্তু বুঝতে পারা আর আদালতে প্রমাণ করতে পারা এক জিনিস নয়। আবার কখনও অপরাধীর উদ্দেশ্য জানার পরে পাঠকের নিজেরই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে -- একে কি নিছক অপরাধ বলা যায়? প্রতিশোধ কি কখনও ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে? আর কোনও অন্যায় থেকে যদি ভালো কিছু জন্ম নেয়, তাহলে সেই অন্যায়ের বিচার কীভাবে হবে?
এই প্রশ্নগুলোর তৈরি উত্তর বইটি পাঠকের হাতে তুলে দেয় না।
সেটাই বোধহয় ‘কালের ফাটল’-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। পাঁচটি গল্পই রহস্যের সমাধানের দিকে এগোয়, কিন্তু শেষ পাতা উল্টোনোর পরেও কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে থাকে।
কারণ সব রহস্যের সমাধান হয়তো সম্ভব। কিন্তু সব সত্যিকে সহজে ভালো কিংবা মন্দের খোপে ফেলা যায় না।
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------



Comments